Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন সাংবাদিক প্রদীপ, মেলেনি শহীদের স্বীকৃতি

জেলা প্রতিনিধি

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। সকালবেলা। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া মোড়। ছাত্র-জনতা মিছিল-সমাবেশ করছে। সেই সমাবেশ ও মিছিলে উত্তাপ বাড়ছেই। পাশেই উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়। সেখানে দলের নেতাকর্মীরা সভায় মতবিনিময় করছিলেন। ওই সময় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের কাছেই রায়গঞ্জ প্রেসক্লাব। হামলা থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আশ্রয় নেন রায়গঞ্জ প্রেসক্লাবে। সেখানে অন্য আরও সাংবাদিকের মতো অবস্থান করছিলেন সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিক। প্রেসক্লাবে হামলা চলা অবস্থায় শহীদ হন তিনি। প্রদীপের ‘জীবনপ্রদীপ’ নিভে যায় চিরতরে। ওই সময় আরও ৮-৯ জন সাংবাদিক আহত হয়েছিলেন। ঘটনার দুই বছর অতিবাহিত হলেও জুলাই শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্বজনেরা। দ্রুত শহীদের মর্যাদার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

প্রদীপ কুমার ভৌমিক রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছি গ্রামের প্রয়াত দিলীপ ভৌমিকের ছেলে। তিনি দৈনিক খবরপত্র পত্রিকার রায়গঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন। ছিলেন রায়গঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি রায়গঞ্জ উপজেলার সাধারণ সম্পাদক, ক্ষেতমজুর সমিতি সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। দুই সন্তানের জনক প্রদীপ সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি নিজ বাড়িতে ডেন্টাল ক্লিনিক পরিচালনা করতেন।

প্রদীপ কুমার ভৌমিক শহীদ হওয়ার আগেই ঘটে আরেক দুর্ঘটনা। ২০২১ সালের মে মাসের শুরুতে নিজ ঘরে সন্ধ্যা আরতির সময় কুপিবাতির আগুনে তাঁর স্ত্রী গীতা রানী ভৌমিকের শরীরে আগুন ধরে যায়। গীতার শরীরের ৮০ শতাংশ ঝলসে যায়। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ২৫ মে মারা যান গীতা।

স্ত্রী গীতার প্রয়াণের ছয় মাস পর প্রদীপ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ওই সময় তাঁর শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে যায়। ছোট ছেলে সুজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসে অসুস্থ বাবার দেখাশোনা করতে থাকেন। দুই বছর পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন প্রদীপ। কিন্তু ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। এ অবস্থায় গত বছরের ৪ আগস্ট আন্দোলনে শহীদ হন তিনি। একের পর এক কষ্ট ভোগ করে শেষে চলে যান না-ফেরার দেশে। প্রদীপের ছোট ছেলে সুজন কুমার ভৌমিক বাবার রেখে যাওয়া ডেন্টাল ক্লিনিকের দেখভাল করছেন। প্রদীপের বড় ছেলে সুব্রত কুমার ভৌমিক নীলফামারীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি সেখানেই থাকেন। দুই ছেলে মায়ের পর বাবাকে হারিয়েছেন। তাদের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। এদিকে ঘটনার দুই বছর অতিবাহিত হলেও জুলাই শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্বজনেরা। 

প্রদীপ কুমার ভৌমিক শহীদ হওয়ার পর সংবাদ সংস্থা এএফপির পক্ষ থেকে এক লাখ ও ঢাকা সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা সহায়তা করা হয়েছে। এছাড়াও সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বাড়িতে এসে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা করেছেন। ঘটনার পর গত বছর কালের কণ্ঠের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত জানুয়ারিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শহীদ সাংবাদিক প্রদীপসহ পাঁচ সাংবাদিক পরিবারকে সম্মাননা স্মারক এবং প্রত্যেককে দুই লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়।

শহীদ সাংবাদিকের ছেলে সুজন কুমার ভৌমিক বলেন, সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাবা (প্রদীপ) কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রায়গঞ্জ প্রেসক্লাবে অবস্থানকালে তিনি শহীদ হন। বাবার নাম জুলাই শহীদদের তালিকায় তুলতে দুই দফা জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা তথ্য অফিসে আবেদন করেছি। তারপরও বাবার নাম শহীদদের তালিকায় তোলা হয়নি। সরকারি দফতরে ঘুরে ঘুরে আমরা ক্লান্ত। 

Prodip2
পারিবারিক পরিমণ্ডলে সাংবাদিক প্রদীপ। ছবি: সংগৃহীত

সুজন বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় পরিবারের কেউ ঘটনাস্থলে ছিল না। অভিযুক্তদের কাউকে চিনি না। বড় ভাই স্ত্রীকে নিয়ে কর্মস্থলে থাকেন। স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে শুধু আমি একা থাকি। নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করা হয়নি। তবে দুঃখের বিষয় দুই বছর অতিবাহিত হলেও আজও স্বীকৃতি মেলেনি আমার বাবার।

রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল খালেক পাটওয়ারী ঢাকা মেইলকে বলেন, সাংবাদিক শহীদ হওয়ার কথাটি আজও প্রথম শুনলাম (আপনার) মাধ্যমে। এ পর্যন্ত আমার সঙ্গে ওই পরিবারটি যোগাযোগ করেনি। আমি ৬ মাস হলো এই উপজেলায় এসেছি। তবে শহীদদের বিষয়গুলো স্থানীয় ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা চিহ্নিত করেন। তারা চিহ্নিত করলে ও শহীদ সাংবাদিকের পরিবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।

সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু ঢাকা মেইলকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পরিবারের পুনর্বাসনে কাজ করছে সরকার। শহীদ পরিবারগুলোর পাশে সবসময় রয়েছে জেলা বিএনপি। এরই মধ্যে শহীদ ও আহতদের স্মরণে বাজার স্টেশন মুক্তির সোপানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। আন্দোলনে নিহত শহীদদের দ্রুত বিচার নিশ্চিতসহ শহীদদের নামে বিভিন্ন স্থাপনা নামকরণের দাবী জানান এই বিএনপি নেতা। 

যাদের রক্তে রাঙা নতুন বাংলাদেশ, তাদের রক্তের ঋণ পরিশোধে শহীদ সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিকের নাম দ্রুত জুলাই শহীদদের তালিকায় অর্ন্তভুক্তিসহ পরিবারটিকে পুনর্বাসন ও ন্যায় বিচার নিশ্চিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার, এমনটিই প্রত্যাশা স্বজনদের।

প্রতিনিধি/জেবি