জেলা প্রতিনিধি
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
‘২০২৪ সালের জুলাই আমার কাছে এখনো দগদগে ঘায়ের মতো’-স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই শুরু করেন তৎকালীন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও আর্তমানবতার সেবামূলক সংগঠন ‘বিবেক’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইউসুফ মোল্লা টিপু। তার ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুমিল্লায় ছাত্র-জনতার ওপর সবচেয়ে নৃশংস হামলাগুলোর একটি চালিয়েছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সশস্ত্র ক্যাডাররা। সেই পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত প্রতিরোধই কুমিল্লাকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে ভূমিকা রাখে। গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে সেই উত্তাল সময়ের নানা স্মৃতি, প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা এবং কুমিল্লার ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন ইউসুফ মোল্লা টিপু।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ ও ওয়াসিম শহীদ হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯ জুলাই শুক্রবার কুমিল্লাতেও বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল। আমাদের নেতাকর্মীরা নগরীর ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ রোডের নিমতলী এলাকায় তৎকালীন সদস্য সচিব ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক বর্তমান কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন ভাইয়ের বাড়ির আশপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন। আমাদের অন্যান্য নেতাকর্মীদের আরেকটি অংশ নগরীর দক্ষিণ চর্থার সৈয়দ বাড়ি গলিতে মানবিক সংগঠন বিবেকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন।
এমন সময় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা নির্বিচারে গুলি চালায় আমাদের ওপর এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে শত শত নেতা কর্মীর ওপর আক্রমণ করে। ওই দিন আমিসহ প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ জন গুলিবিদ্ধ হই। আমাদের একজন কর্মী ছোটনের পায়ের রগ কেটে দিয়ে ঘটনাস্থলেই তাকে গুলি করা হয়। যুবদলের রোমান, মহিউদ্দিন, রনি এবং আরও অনেক নেতা কর্মী ওই হামলায় গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনাটি ঘটে আমাদের বিবেক কার্যালয়ের সামনেই।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রায় দশ মিনিটের মধ্যে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম ভূঁইয়া আমার খোঁজ নেন। তিনি জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাহেব আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই আমি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারিনি। আমাদের চর্থা এলাকার এক ফার্মাসিস্ট তাৎক্ষণিকভাবে আমার রক্তপাত বন্ধ করার ব্যবস্থা করেন। এরপরও পরিস্থিতির কারণে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ হয়নি।
তবে আহত হলেও আমাদের আন্দোলন এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি। সেদিন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলেও আমরা বিভিন্ন উপায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যাই। আগস্ট পর্যন্ত টানা কর্মসূচি অব্যাহত ছিল। অবশেষে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ৭ আগস্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমার শরীর থেকে গুলি অপসারণ করা হয়। আমরা দীর্ঘ ষোল থেকে সতেরো বছর ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ফ্যাসিবাদের পতনের লক্ষ্যে আন্দোলন করে আসছিলাম। যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ব্যাপক রূপ নেয়, তখন আমাদের দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দেশ দেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা জনবলসহ সবধরনের সহযোগিতা করেছি, যাতে করে আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।
বিএনপির এই নেতা বলেন, আমাদের হাজার হাজার নেতা কর্মী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেন এবং শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের পাশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন। আমি বিশ্বাস করি, জুলাইয়ের এই আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তি, দল বা সংগঠনের কৃতিত্ব নয়। এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি গণআন্দোলন। তাই এই আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। এটি ছিল আপামর জনতার আত্মত্যাগের ফসল। আমি এই আন্দোলনের সব শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। যারা আহত হয়েছেন, বিশেষ করে যারা এখনো সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না, তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। আমি তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করছি। ইতোমধ্যে চিকিৎসাধীন কয়েকজনকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছি এবং আরও অনেকের তালিকা করেছি। পর্যায়ক্রমে তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া ও সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হয়েছে, তাদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যেতে পারে না। আমরা দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাই। সেই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি এবং ইনশাল্লাহ সব ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিতপরিবর্তন আসবে। এই প্রত্যাশাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।
প্রতিনিধি/জেবি