Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বিচার ও স্বীকৃতির অপেক্ষায় নোয়াখালীর শহীদ পরিবারগুলো 

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

হাজারো ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছিল দেশ। পতন হয়েছিল তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার। রক্তক্ষয়ী সেই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর হয়ে গেলেও আজও বিচার ও স্বীকৃতির অপেক্ষায় শহীদ পরিবারগুলো। থামেনি তাদের শোকের মাতম।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারি বাহিনীর বুলেটের আঘাতে এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো ক্যাডারদের হামলায় অনেকেই তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন। সীমাহীন সেই বেদনা আর বিচার না পাওয়ার ক্ষোভ আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। প্রতিটি দিন যেন তাদের কাছে একেকটি দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

ঢাকায় পুলিশের বুলেটে প্রাণ যায় নোয়াখালীর ছেলে সজীবের

দুই ভাইয়ের মধ্যে মোহাম্মদ সজীব ছিলেন বড়। অভাবের সংসারের হাল ধরতে এবং একটু সচ্ছলতা ফেরাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি রঙের দোকানে চাকরি শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের সেই রক্তঝরা দিনে সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় পুলিশের বুলেটে প্রাণ হারান সজীব। 

ছেলে হারানোর দুই বছর পার হতে চললেও এখনো বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন এই জুলাই শহীদের বাবা অটোরিকশাচালক মো. সালাউদ্দিন।

অশ্রুসজল কণ্ঠে তিনি জানান, জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চাকরি করছিলেন সজীব। কোরবানি বা রমজানের ঈদেও বাড়ি আসেননি। কথা ছিল জুলাইয়ের শেষ দিকে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবেন। কিন্তু পৃথিবী থেকেই ছুটি নিয়ে পরপারে পাড়ি জমান সজীব। কেউ কবর জিয়ারত করতে এলে কবরের সামনে থেকে তিনি সরতে পারেন না বলে জানান এই শহীদের বাবা।

কলেজ শিক্ষার্থী ছেলেকে হারানো শোকের পাথর এখনো বয়ে চলেছেন বাবা

নোয়াখালী সদর উপজেলায় নিজ হাতে একমাত্র ছেলে রায়হানের কবর পরিষ্কার করছিলেন বাবা মোজাম্মেল হোসেন। কবরের প্রতিটি ধূলিকণা যেন তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রিয় সন্তানের স্মৃতিতে। বুকভরা কষ্ট আর অপার শূন্যতা নিয়েই প্রতিদিন ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় মিছিলে অংশ নিতে রাজধানীর বাড্ডায় যান ঢাকা কমার্স কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রায়হান। সেখানে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান তিনি। দুই বছর পার হয়ে গেলেও শোকের ভারী পাথর এখনো বয়ে চলেছে এই পরিবারটি।

p2_copy

রায়হানের বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘এ পর্যন্ত আসলে আমরা মনরে বুঝাইতে পারি নাই। রায়হান যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, আমাদের ঘর অন্ধকার। একমাত্র ছেলে হারায়ে আমরা এখন অসহায় অবস্থায় আছি।’

অন্যদিকে ছেলের কথা উঠলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা আমেনা খাতুন। তার কাছে প্রতিটি দিন যেন সন্তানকে ফিরে পাওয়ার এক অসমাপ্ত অপেক্ষা। তার আকুতি, ‘আজ দুই বছর হইছে আমার সন্তান আমারে আর বোলে (ডাকে) না। ৫ আগস্ট আসতেছে, কিন্তু আমার ছেলে আসে নাই।’

শুধু রায়হানই নন, একই দিনে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মোহাম্মদ ইয়াসিন ও হাসান নামে দুই যুবক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান হারিয়ে দিশেহারা তাদের পরিবার। দুই বছরেও থামেনি তাদের কান্নার রোল। শেষ হয়নি বিচার পাওয়ার অপেক্ষা।

শহীদ হাসানের মা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার হাসান সকালে সোনাইমুড়ী বাজারে আম বিক্রি করতে গেছিলো। সাড়ে ১০টা বাজছে আমার ছেলে মারা গেছে। আমি থানার সামনে গেছি, কেউ বলে না আমার ছেলে তো মারা গেছে।’

এদিকে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করাও ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচারকার্য শেষ করার দাবি জানিয়েছেন।

নোয়াখালী জেলা সমন্বয়ক আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা অনতিবিলম্বে সরকারের কাছে দাবি জানাই, জুলাই হত্যার বিচার যেন দ্রুত শেষ করা এবং পরিবারগুলো যেন সাহায্য-সহযোগিতা পায়। শহীদদের বাবা-মায়েরা যেন জীবিত থাকা অবস্থায় দেখে যেতে পারেন, তাদের সন্তান হত্যার বিচার হয়েছে। জুলাই শহীদদের সম্মানে দ্রুত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নেরও দাবি জানাই।’ 

নোয়াখালী নাগরিক উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক এস এম সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় শহীদদের লাশগুলো যখন আমাদের জেলায় আসছিল, পরিবারগুলোর শূন্যতা তখন আমাকে তাড়া করছিল। সেই দায়বদ্ধতা থেকে বেগমগঞ্জ উপজেলার ৯টি শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’

তিনি জানান, ‘কবর জিয়ারতের সময় অনেক পরিবারকে দেখেছি কবর ছেড়ে যেতে চান না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ আত্মত্যাগকারী সকল শহীদকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ এবং উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারানো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে টেকসই সহায়তা দেওয়া হোক।’

উল্লেখ্য, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নোয়াখালীর ২৬ জন দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ হন। এছাড়া গুরুতর আহত হন দুই শতাধিক। প্রিয়জনের এই আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন ও সুবিচার পাওয়ার মাধ্যমে শোকাহত পরিবারগুলো কিছুটা হলেও শান্তি পাবে- এমনটাই প্রত্যাশা নোয়াখালীবাসীর।

প্রতিনিধি/এএইচ