০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
একটি ঘর। একটি পড়ার টেবিল। সাজানো বই-খাতা। পাশে স্কুল ব্যাগ, আর অর্জনের স্মারক। সবই আছে, শুধু নেই সেই মানুষটি। ঢাকার সাভারের ইসলামনগরের ঘরটিই ছিল আলিফ আহমেদ সিয়ামের স্বপ্নের ঠিকানা। দশম শ্রেণির মেধাবী এ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও ছিল তার সাফল্যের ছাপ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে আন্দোলনে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিল সিয়াম। মায়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দেয় সে। মায়ের সঙ্গে সেটিই ছিল তার শেষ দেখা।
আলিফ আহমেদ সিয়ামের মা তানিয়া বেগম বলেন, আমি তো আমার ছেলেকে খুঁজে পাই না। বিছানায় এসে দেখি বিছানাটা আগের মতো পড়ে আছে। টেবিলটা ফাঁকা, বিছানাটা ফাঁকা। আমার বাবা বিছানায় নাই। আমার খালি আমাকে ছেড়ে যে সত্যি চলে যাবে। আমি বুঝি নাই।
আলিফ আহমেদ সিয়ামের বাবা বুলবুল কবির বলেন, আমাদের দাবি ও ১৪০০ শহীদ পরিবারের কাছ থেকে ও সবার পক্ষ থেকে আমার দাবি, আমাদের জুলাই সনদ এবং আমাদের শহীদ হত্যার বিচার, আহতদের চিকিৎসা এবং জুলাই সনদ। এটাই আমার সরকারের কাছে দাবি।
সেদিন দুপুরে সাভার থানা স্ট্যান্ড এলাকায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয় সিয়াম। গুরুতর অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুই দিন মৃত্যুর মুখোমুখি থেকে ৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারাবার শোক এখনো তাঁড়িয়ে বেড়ায় সন্তানহারা পিতাকে।
সিয়ামের মতোই ৫ আগস্টের সহিংসতায় থেমে যায় আরেকটি স্বপ্নবাজ যুবকের অগ্রযাত্রা। তার নাম শ্রাবণ গাজী। পরিবারের একমাত্র ছেলে শ্রাবণ মালয়েশিয়াতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করছিলেন। ২৪ এর ১৬ জুলাই ছুটিতে দেশে আসার পর জড়িয়ে পড়েন গণঅভ্যুত্থানে। ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সকালে বাসা থেকে বের হন শ্রাবণ। দুপুরে সাভার বাসস্ট্যান্ড ও নিউমার্কেট এলাকায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে তাকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা বাঁচাতে পারেননি।
ছেলেকে হারানোর পর বদলে গেছে বাবা মান্নান গাজীর জীবন। প্রায় প্রতিদিনই ছেলের কবরের পাশে যেন চলে পিতা-পুত্রীর নীরব কথোপকথন। এ সময় অজান্তে চিবুক গড়িয়ে পড়ে নোনা জল আর দীর্ঘশ্বাস।
মান্নান গাজী বলেন, সব বাবারই একই রকম লাগবে। কারণ সে তো আমার সন্তান। আমার সন্তান আমার চোখের সামনে রক্তেমাখা থাকবে, সেটা আমার কেমন লাগবে?
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সাভারের শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়াম ও শ্রাবণ গাজীর পরিবারের সময় যেন থমকে আছে সেই ৫ আগস্টেই। সন্তান হারানোর শোক আজও নোনাজল হয়ে ঠাঁই নেয় বাবা-মায়ের চোখে। স্মৃতির ভার আর বিচারের অপেক্ষায় দীর্ঘশ্বাসী যেন নিত্যসঙ্গী শহীদ স্বজনদের। সবার প্রশ্ন একটাই কবে বিচার হবে?
প্রতিনিধি/জেবি