Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

১৭ শহীদের রক্তে লেখা হবিগঞ্জের জুলাই গণঅভ্যুত্থান

জেলা প্রতিনিধি

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

জুলাই-আগস্টের উত্তাল গণআন্দোলনে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছিল হবিগঞ্জ। রাজপথে নেমেছিল ছাত্র-জনতার ঢল। একদিকে পুলিশের গুলি, লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষ; অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া-সব মিলিয়ে দিনগুলো হয়ে উঠেছিল ভয়াবহ ও রক্তাক্ত।

আন্দোলনের সময় হবিগঞ্জে প্রাণ হারান অন্তত ১৭ জন। তাদের মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। হবিগঞ্জ শহর ও বানিয়াচংয়ে নিহত হন ১২ জন। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে গিয়ে নিহত হন হবিগঞ্জের আরও কয়েকজন। গুলিতে আহত হয়ে কেউ হারিয়েছেন চোখের দৃষ্টি, কেউ হয়েছেন পঙ্গু। আবার কারও শরীরে এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে অসংখ্য স্পিøন্টারের যন্ত্রণা।

প্রাণহানি, রক্তপাত আর নির্যাতনের সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় স্বজন ও আহতদের। তাদের কাছে জুলাইয়ের দিনগুলো কেবল একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়-এটি আপনজন হারানোর বেদনা, শরীরে বয়ে বেড়ানো ক্ষত আর অধিকার আদায়ের এক রক্তাক্ত অধ্যায়।

হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্যমান সূচনা হয় ১৬ জুলাই শায়েস্তাগঞ্জ গোলচত্বরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধের মধ্য দিয়ে। সেদিন আন্দোলনকারীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

অবরোধের শেষ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু নেতাকর্মী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং কয়েকজন ছাত্র আহত হন।

এরপর আর পেছনে ফেরেনি আন্দোলন। হবিগঞ্জ সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিদিনই চলতে থাকে বিক্ষোভ, মিছিল, সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু হামলা, বাধা কিংবা ভয়ভীতি কিছুই আন্দোলনকারীদের রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি।

২ আগস্ট হবিগঞ্জ শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নামলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়।

সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বিদ্যুৎ শ্রমিক মোস্তাক আহমেদ (৩২)। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্দোলনের উত্তাপ আরও বেড়ে যায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ।

সেদিন জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে তৎকালীন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এবং সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খানের বাসভবনেও হামলার ঘটনা ঘটে। পরদিন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিরোধ কর্মসূচিতে নামে।

৪ আগস্ট দুপুরে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সামনে থেকে ছাত্র-জনতার একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তিনকোনা পুকুরপাড় এলাকায় পৌঁছালে টাউন হল এলাকায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষের মধ্যে নিহত হন সেলুনকর্মী রিপন শীল (২৪)। তার মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা পিছু হটে বিভিন্ন স্থান থেকে সরে যায়।

এ সময় বেশ কিছু নেতাকর্মী তৎকালীন সংসদ সদস্য আবু জাহিরের বাসভবনে অবস্থান নেন। পরে ছাত্র-জনতা বাসভবনটি ঘেরাও করে ফেললে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ছাত্র-জনতা বাসভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে ভেতর থেকে প্রতিরোধের ঘটনা ঘটে। ফলে বাসভবনটি সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে বিপুলসংখ্যক সেনা সদস্য সেখানে গিয়ে আবু জাহিরসহ বাসায় অবস্থানরতদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা ওই বাসভবনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

৪ আগস্টের রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর হবিগঞ্জ শহরে নেমে আসে থমথমে পরিবেশ। অপেক্ষা চলতে থাকে পরবর্তী দিনের। ৫ আগস্ট বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পর সারাদেশের মতো হবিগঞ্জেও শুরু হয় বিজয় মিছিল। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে বের হন। হবিগঞ্জ শহরে বিজয় মিছিলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আবু জাহিরের বাসভবন এলাকা।

Habigonj2

মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুর করে। জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থাপনাতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

এছাড়া অ্যাডভোকেট আবু জাহির, সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ খান এবং হবিগঞ্জ পৌরসভার তৎকালীন মেয়র আতাউর রহমান সেলিমের বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।

হবিগঞ্জ শহরের পাশাপাশি এশিয়ার বৃহত্তম গ্র্রাম হিসেবে পরিচিত বানিয়াচংয়েও ৫ আগস্ট পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বানিয়াচং শহীদ মিনার থেকে একটি বিজয় মিছিল বের হয়ে থানার সামনে পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায় বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ। এরপর মিছিলকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়।

কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে একে একে প্রাণ হারান অন্তত নয়জন। নিহতরা হলেন-হাসান মিয়া (১২), আশরাফুল (১৭), মোজাক্কির (৪০), নয়ন হোসেন (১৮), তোফাজ্জল হোসেন (১৮), সাদিকুর রহমান (৩০), সুহেল আখঞ্জি, মো. আনাছ মিয়া ও আকিনুর রহমান। একই ঘটনায় ছাত্র-জনতার পিটুনিতে বানিয়াচং থানার এসআই সন্তোষ চৌধুরী নিহত হন বলে জানা যায়।

একটি দিনের সংঘর্ষে এতগুলো প্রাণহানি বানিয়াচংয়ের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্না আর আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শুধু হবিগঞ্জ নয়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়েও প্রাণ হারান হবিগঞ্জের কয়েকজন তরুণ। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আজমত খান, শেখ সফিকুল ইসলাম, মামুন আহমেদ রাফসনি, নাহিদুল ইসলাম ও কারিমুল ইসলাম।

তারা কেউ শিক্ষার্থী, কেউ কর্মজীবী। কিন্তু আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সবাই নেমেছিলেন রাজপথে। শেষ পর্যন্ত আর ঘরে ফেরা হয়নি তাদের।

জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলন শেষ হয়েছে, এসেছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিজয়ের দিন। রাজপথে বিজয় মিছিল হয়েছে। উল্লাসে মেতেছে মানুষ। কিন্তু যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের কাছে সেই উল্লাসের আড়ালে রয়েছে গভীর শোক। যারা গুলিতে আহত হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কারও চোখের আলো নিভে গেছে, কেউ হয়েছেন স্থায়ীভাবে পঙ্গু। কারও শরীরে এখনো রয়েছে গুলির ক্ষত কিংবা স্পিøন্টারের অসংখ্য চিহ্ন। তাদের শরীরের প্রতিটি ক্ষত যেন সেই উত্তাল সময়ের নীরব সাক্ষী।

হবিগঞ্জের রাজপথের সেই রক্তাক্ত দিনগুলো তাই কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের অধ্যায় নয়। এটি ১৭টি পরিবারের শোক, অসংখ্য আহত মানুষের যন্ত্রণা এবং একটি প্রজন্মের সংগ্রামের স্মৃতি।

রক্তের দাগ হয়তো রাজপথ থেকে মুছে গেছে। কিন্তু মোস্তাক, রিপন, হাসান, আশরাফুল, মোজাক্কির, নয়ন, তোফাজ্জল, সাদিকুর, সুহেল, আনাছ, আকিনুরসহ নিহতদের নাম ও স্বজনদের কান্না হবিগঞ্জের ইতিহাসে থেকে যাবে-এক রক্তাক্ত জুলাই-আগস্টের সাক্ষ্য হয়ে।

প্রতিনিধি/জেবি