জেলা প্রতিনিধি
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে মাগুরার প্রথম শহীদ মেহেদী হাসান রাব্বি দেখে যেতে পারেননি তার নবজাত কন্যাকে। বাবা নিহত হওয়ার ৪ মাস ৭ দিন পর দুনিয়াতে আসে কন্যা মেহেরিমা।
মেহেরিমা রাব্বি’র বয়স এখন ১৯ মাস। সে বাবা ডাকতে শিখেছে। ছোট্ট শিশু মেহেরিমা বাবাকে খুঁজতে শিখেছে এখন। বাবা কোথায় এর কোনো উত্তর দিতে না পেরে চোখের জল মোছেন মেহেদী হাসান রাব্বির স্ত্রী রুমি খাতুন।
পারবারিক সূত্রে জানা যায়, মাগুরা শহরের বরুনাতৈল এলাকার ময়েন উদ্দিন বিশ্বাস ও সালেহা বেগমের ছেলে রাব্বি। বাবা-মায়ের ৬ সন্তানের মধ্যে রাব্বি ছিলেন চতুর্থ সন্তান। মাগুরা সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন তিনি। রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়াও এলাকার বিভিন্ন মানবিক ও সমাজিক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন রাব্বি।
চব্বিশের ৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সাথে মিছিল করার জন্য শহরের পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়া মসজিদের সামনে অবস্থান নেয় স্থানীয় ছাত্র-জনতা।
সমন্বয়কারীদের সাথে পুলিশের কথা হয়েছিল, শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে শহরের চৌরঙ্গী মোড় হয়ে আবার মসজিদের সামনে ফিরে আসবে। এ সময় শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিল স্থানীয় ছাত্র-জনতা। কিন্তু মিছিল নিয়ে ঢাকা রোড নবগঙ্গা ব্রিজে ওঠার পর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের বাধার মুখে পড়ে। মিছিলের অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনতার সাথে রাব্বিও এগিয়ে আসেন। এসময় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ধাওয়া চলাকালে মিছিলে গুলি চালালে রাব্বির বুকের নিচে পাজরে গুলিবিদ্ধ হয়। আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে মাগুরা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় দুপুর ১টার দিকে রাব্বি মারা যান। রাব্বি জেলা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

মামলার বিচার কার্যক্রম এখনো শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ রাব্বির স্ত্রী রুমি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন, যত দ্রুত সম্ভব আমার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করুন। শুধু আমার স্বামীর নয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া দেশের প্রতিটি মানুষের হত্যার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করুন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী রুমি বলেন, আমি একজন শিক্ষিত নারী। আমাকে যদি কোনোভাবে একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে আমার সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকা কিছুটা সহজ হবে। দেশের বিভিন্ন জেলায় শহীদদের অনেক স্ত্রী সরকারি চাকরি পেয়েছেন, কিন্তু আমি এখনো সে সুযোগ পাইনি। পাশাপাশি আমার এতিম সন্তানটির কথাও যেন কেউ ভুলে না যান। এই পৃথিবীতে তার বাবার ছায়া নেই। সরকার যে আর্থিক অনুদান দেয়, ওয়ারিশ আইনের কারণে তার একটি অংশই আমি পাই। অথচ আমার সন্তানকে লালন-পালন ও মানুষ করার পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধেই।
তিনি আরও বলেন, শুরুর দিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা আমাদের খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই খোঁজ নেওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি ঈদের সময়ও কোনো এমপি বা মন্ত্রী আমাদের খোঁজ নেননি। অথচ রাব্বির মতো শত শত শহীদের রক্তের বিনিময়েই আজ অনেকেই এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। এখন কেবল প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি থাকলেই আমাদের জানানো হয়।
প্রতিনিধি/জেবি