০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুর ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে আন্দোলনে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন। তার আত্মত্যাগই পুরো দেশের ছাত্র-জনতাকে এক নতুন প্রেরণা ও অভূতপূর্ব ঐক্য জুগিয়েছিল। পুলিশের বন্দুকের সামনে আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য সারাদেশে প্রতিবাদের আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। ওই ঘটনায় কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে আন্দোলন সরকার ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট ততকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছিল।
চব্বিশে সারাদেশের মতো পুরো জুলাই মাস ও আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত রংপুর ছিল উত্তপ্ত। সব বাধা উপেক্ষা করে রাজপথ দখলে রেখেছিল ছাত্র-জনতা। আন্দোলনে তিন দফায় হয়েছেন ৬ জন। এই আন্দোলনে সারাদেশের মধ্যে শহীদের তালিকায় প্রথম নাম লেখান আবু সাঈদ। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় শহীদ হন অনেকে। আবু সাঈদের পর রংপুরে শহীদ হন অটোচালক মানিক মিয়া। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই শহীদ হন। এরপর ১৯ জুলাই ছিল রংপুরের জন্য একটি রক্তাক্ত দিন। সেদিন পুলিশের গুলিতে রংপুরে ঝরে ৪টি তাজা প্রাণ। তবে স্বজন হারানোর দুই বছর কেটে গেলেও এতটুকু শোক কাটেনি রংপুরের এই ৬ শহীদ পরিবারের। স্বজনহারা পরিবারগুলো বিচারের আশায় তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে।
আবু সাঈদ দিয়ে শুরু
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সারাদেশের মধ্যে প্রথম শহীদ হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে।
লাঠিচার্জের সময় ছাত্রদের সবাই সরে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আবু সাঈদ হাতে একটি লাঠি নিয়ে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান। এই অবস্থায় পুলিশ আনুমানিক মাত্র ৫০-৬০ ফুট দূর থেকে তার উপর ছররা গুলি ছুড়েন। গুলির আঘাতে আবু সাঈদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পরলে উত্তপ্ত হতে থাকে রংপুর। আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ১৮ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকালে নগরীর মডার্ন মোড়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে অটোরিকশা চালক ঘাঘট পূর্ব পাড়ার মানিক মিয়া শহীদ হন।
সেদিন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ অফিস, জাতীয় শ্রমিক লীগ অফিস, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়, তাজহাট থানা, নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িসহ কয়েকটি ভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।
তিন দিনে দুই হত্যায় ফুঁসে উঠে পুরো রংপুর
তিন দিনের ব্যবধানে দুইজনের মারা যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বিগুণ ক্ষোভ নিয়ে ফুঁসে উঠেন আন্দোলনকারীরা। পরের দিন ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। সকাল থেকেই পুরো নগরীতে ছিল থমথমে অবস্থা।
পূর্ব ঘোষণা ছিল জুমার নামাজের পর জিলা স্কুলের সামনে গায়েবানা জানাজা আদায় করা হবে। এমন প্রস্তুতি নিয়ে জুমার নামাজের পরপরই ধীরে ধীরে মানুষ জমায়েত হতে থাকেন জিলা স্কুলের আশেপাশে। অন্যদিকে, প্রশাসনের প্রস্তুতিও অন্যান্য দিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ছিল।
জুমার নামাজের পর সেই গায়েবানা জানাজা করতে না পেরে বিক্ষোভে ফেটে পরে আন্দোলনকারীরা। এরপরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ ছড়িয়ে পরে রংপুরের নিউ মার্কেট, সিটি বাজার ও টাউনহল চত্বর এবং জিলা স্কুলের দিকে।
পরে বিকেল ৩টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনের বিশাল বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নিয়ে রাজপথে নামেন। মুহূর্তেই গোটা নগরী উত্তাল হয়ে ওঠে।
নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে বের হওয়া অসংখ্য মিছিল শাপলা চত্বর, গ্র্যান্ড হোটেল মোড়, জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, সুপার মার্কেট, রাজা রামমোহন মার্কেট, জেলা পরিষদ মিনি সুপার মার্কেট, সিটি মার্কেটসহ প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জিলা স্কুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
নগরীতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত বিজিবি। তখন পুলিশ বাহিনীর শত শত সশস্ত্র সদস্য আর্মড পার্সোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি) নিয়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলের বিপরীত দিক থেকে আক্রমণাত্মকভাবে ছুটে আসছিল। পুলিশের অস্ত্রের সামনে ইটপাটকেল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র-জনতা। নগরীর টাউনহল থেকে পায়রা চত্বর পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা বলপ্রয়োগ করে এবং মারমুখী হয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে। সেই দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে নগরীর পূর্ব শালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, গণেশপুরের স্বর্ণ শ্রমিক মোসলেম উদ্দিন, নিউ জুম্মাপাড়ার ফল ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম ও ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল তাহিরের মৃত্যু হয়। রংপুরের সেদিনের এই রণক্ষেত্র অবস্থা রাত অবধি চলতে থাকে।
শহীদ পরিবারের শোক কাটেনি
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে রংপুরের শহিদ পরিবারের মাঝে এখনও শঙ্কা কাটেনি। স্বজন হারানোর দুই বছরেও এতটুকু শোক কাটেনি তাদের। বিচারের আশায় তাকিয়ে সরকারের দিকে সেই শহীদপরিবারগুলো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের রায় দিলেও অন্যান্য শহীদের ক্ষেত্রে এখনও বিচারকাজ শুরুই হয়নি। দ্রুত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিচার কাজ শেষে দায়ীদের বিচার হোক এই চাওয়া শহীদ পরিবারগুলোর।
আবু সাঈদের পিতা মকবুল হোসেন বললেন, ‘দেখতে দেখতে ছেলে হত্যার দুই বছর হয়ে গেল। ছেলে হারানোর ব্যথা বুক থেকে কখনও হারাবে না। প্রতিটি সময়ে ছেলেকে মনে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘ছেলে হত্যার ঘটনায় আদালত যে রায় দিয়েছে। ছেলে হত্যার রায় যদি বেঁচে থাকতে দেখতে পেতাম, তাহলে একটু হলেও মনটা সান্ত্বনা পেতো।’
এ সময় মামলার সব আসামির দ্রুত ফাঁসি দাবি করে রায় কার্যকর চান আবু সাঈদের পিতা।
১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া রংপুর নগরীর পূর্ব শালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেনের স্ত্রী জিতু বেগম বলেন, ‘দুই বছর ধরে স্বামী হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনও স্বামী হারানোর বিচার পেলাম না।’
তিনি বলেন, ‘এখনও তদন্তই শেষ হয়নি, চার্জশীটও দাখিল হয়নি। বিচার কবে শুরু হবে তার ঠিক নাই।’
বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দেশের জন্য স্বামী জীবন দিল। আমাকে বিধবা করলো, সন্তানদের পিতৃহীন করলো। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বিচার শুরুর কোনো উদ্যোগ নেই।’
শহিদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজনিন ইসলাম বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। প্রতি মাসে সরকারের পক্ষ থেকে যা পাই তা দিয়ে কোনোমতো সংসার চালাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সন্তানরা প্রতিটি সময় তার বাবাকে মিস করে।’
এসময় সরকারের কাছে হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার চান মেরাজুলের স্ত্রী।
শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের পিতা আব্দুর রহমান বলেন, ‘ছেলের স্বপ্ন ছিলো লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরবেন। সেই হাল আর ধরতে পারলেন না। দেশের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হলেন।’
তিনি বলেন, ‘ছেলে হত্যার ঘটনায় মামলা হলেও এখন কোন পর্যায়ে আছে তা জানা নাই। আদৌ এই মামলাগুলো শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না সন্দেহ আছে। তিনি সরকারের কাছে ছেলে হত্যার দ্রুত বিচারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রতিনিধি/এমআর