Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

১০৩ বুলেটের ক্ষত বুকে নিয়ে আশরাফুলের বেঁচে ফেরার গল্প

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

দিনটি ছিল ১৮ জুলাই ২০২৪। সকালে কুষ্টিয়ার বাতাসে তখন এক থমথমে উত্তেজনা, আকাশে বারুদের কটু গন্ধ। রাজপথ কাঁপিয়ে স্লোগান তুলছিল একদল তরুণ—সামনে নতুন ভোরের স্বপ্ন, চোখে বৈষম্যহীন আর মুক্ত সমাজের ব্যাকুলতা। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামও ছিলেন সেই অকুতোভয় তরুণদের মিছিলে।

কিন্তু সেদিন আশরাফুল জানতেন না, কিছুক্ষণের মধ্যেই ইতিহাস তাকে এমন এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাবে, যার ক্ষত চিহ্ন তিনি বহন করবেন সারা জীবন। এটি কেবল এক ছাত্রনেতার মিছিলে যাওয়ার গল্প নয়; এটি একটি জীবন, ১০৩টি ছররা বুলেটের আঘাত আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম দেখার গল্প।

সকালের সূচনা: মিছিল থেকে আবার রাজপথে
১৮ জুলাই সকাল ১০টার আগেই নির্ধারিত ছিল কুষ্টিয়া শহরের আন্দোলনকারীদের মূল জমায়েত। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের গেট থেকে শুরু হয় মিছিল। আশরাফুল এবং তার সহযোদ্ধাদের কণ্ঠফাটা স্লোগানে কেঁপে ওঠে চারপাশ। মিছিলটি শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌরহাস পর্যন্ত গিয়ে থামে।
দুপুরের দিকে আশরাফুল সামান্য সময়ের জন্য বাসায় ফেরেন খাবারের উদ্দেশে। কিন্তু চারপাশের উত্তাল পরিস্থিতি আর রাজপথের ডাক তাকে ঘরে থিতু হতে দেয়নি। বুকে এক তীব্র অস্থিরতা নিয়ে আবার বের হন তিনি। ছোট ভাই ইমনকে ফোন দিয়ে সাথে নেন, পথেই দেখা হয়ে যায় বন্ধু সাদ্দামের সাথে—সেও যোগ দেয় এই মুক্তির মিছিলে।

মৃত্যুকূপের দিকে যাত্রা: হাসপাতালের গলি ও কলকাকলি স্কুল
প্রধান সড়কে তখন পুলিশ ও প্রশাসনিক বাহিনীর কড়া টহল। গ্রেফতার এড়াতে তারা তিনজনে শহরের ভেতরের গলি দিয়ে এগোতে থাকেন। মোটরসাইকেলটি হাসপাতালের সামনে রেখে পায়ে হেঁটে যখন মূল সড়কের কাছাকাছি পৌঁছান, ততক্ষণে চারপাশ যেন যুদ্ধক্ষেত্র।

চারিদিকে রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস আর ছররা গুলির শব্দ। পুলিশের নিক্ষিপ্ত গুলিতে ইতিমধ্যেই রক্তাক্ত ও আহত হয়েছেন অসংখ্য আন্দোলনকারী। সহযোদ্ধাদের রক্ত দেখে স্থির থাকতে পারেননি আশরাফুল। রাজপথ থেকে কুড়িয়ে নেন একটি লাঠি আর কিছু ইট।

কলকাকলি স্কুলের সীমানা দেওয়ালের পাশে অবস্থান নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মাঝে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছিলেন তারা। পুলিশের নির্বিচার টিয়ারশেল ও গুলির মুখে ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছিলেন আশরাফুল।

সেই ভয়াল মুহূর্ত: পিঠে বিঁধল ঘাতকের গুলি
হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে যায়। আচমকা একটি সাদা রঙের পুলিশ ভ্যান তাদের একেবারে কাছে চলে আসে। আশরাফুল মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে গাড়িটির একদম মুখোমুখি আবিষ্কার করেন।

বিপদ বুঝে নিজেকে রক্ষায় ঘুরে পেছনে দৌড় দিতে যান তিনি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পেছন ফিরতেই ঘাতকের বন্দুক থেকে গর্জে ওঠে ছররা গুলি। ঝাঁকে ঝাঁকে তপ্ত সিসা এসে বিঁধে যায় তার পিঠে, সমানে ঝাঁঝরা হয়ে যায় শরীর।

ঘুরে দৌড়াতে গিয়ে পিছন ফিরতেই পুলিশ আমাকে গুলি করে দেয় — সেদিনের ভয়াল স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে শিউরে ওঠেন আশরাফুল।

ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি শরীরে বিঁধতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চারপাশ তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। এক অপরিচিত ভাই ছুটে এসে আশরাফুলকে জড়িয়ে ধরেন এবং চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘সবাই আসেন! এই ভাইয়ের গায়ে গুলি লেগেছে!’
রক্তের তীব্র স্রোত আর অসহ্য যন্ত্রণায় কিছুক্ষণ পরেই চেতনা হারান আশরাফুল।

রক্তাক্ত শরীর ও জীবনযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়
কয়েক মুহূর্ত পর যখন সাময়িকভাবে জ্ঞান ফেরে, তখন আশরাফুল দেখেন তার চারপাশে একদল সাধারণ মানুষ। তার গায়ের রক্ত মুছে দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন তারা। বুকে, পিঠে, ঘাড়ে তখন বিঁধে আছে একের পর এক সিসার বুলেট। ব্যথা বোঝার শক্তিও যেন হারিয়ে গেছে রক্তক্ষরণে।

উপস্থিত জনতা আর আন্দোলনকারীরা দ্রুত একটি রিকশা ডেকে তোলেন তাকে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আশরাফুলকে।

পরে চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে এক অবিশ্বাস্য তথ্য—একটি বা দুটি নয়, আশরাফুলের শরীরে একাই বিঁধেছে প্রায় ১০৩টি ছররা বুলেট! একটি মানবদেহে ১০৩টি সিসার টুকরো বহন করে বেঁচে থাকাটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের চোখেই এক অলৌকিক ঘটনা।

প্রতিবাদের প্রতীক: এক অদম্য আশরাফুল
জুলাইয়ের এই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে যারা নিজেদের রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখেছেন, মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম তাদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম। শরীরের গভীরে গেঁথে থাকা ১০৩টি বুলেট প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে তাকে মনে করিয়ে দেয় সেই রক্তঝরা ১৮ জুলাইয়ের কথা।

আশরাফুলের এই আত্মত্যাগ কেবল কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। শত বুলেটের ক্ষত চিহ্ন বুকে নিয়ে আজও আশরাফুল দাঁড়িয়ে আছেন—একটি স্বৈরাচারমুক্ত, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে।

প্রতিনিধি/এমআই