Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বিক্ষুব্ধ জনতা জ্বালিয়ে দেয় এনায়েতপুর থানা, পিটিয়ে মারে ১৫ পুলিশকে

জেলা প্রতিনিধি

০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি। সেদিন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানা পরিণত হয়েছিল ভয়াবহ সহিংসতার কেন্দ্রে। আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে থানায় দফায় দফায় হামলার মুখে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণের চেষ্টা করেও রক্ষা পাননি। প্রাণ বাঁচাতে কেউ থানার ছাদে, কেউ পাশের বাড়িতে, কেউ শৌচাগারে, আবার কেউ আশপাশের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেও তাদের খুঁজে বের করে ওসিসহ ১৫ পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান চলাকালে এটি ছিল পুলিশ সদস্যদের প্রাণহানির অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। সেই ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। আলোচিত এই ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা। ৫-৬ হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার সামনে আসে। মূলত সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহাজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা নিয়ে এনায়েতপুর থানা গঠিত। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে চৌহালী উপজেলার শেষ সীমানায় এ থানার অবস্থান। আন্দোলনকারীরা প্রথম দফায় পুলিশের অনুরোধে ফিরে যায়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আবারও হাজারো মানুষ জড়ো হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিনজন নিহত হন। এরপর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা আন্দোলনকারীদের হামলায় পুলিশের ১৫ জন সদস্য নিহত হন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরো থানা ক্যাম্পাস অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লুট করা হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। সে দিনের ঘটনায় এনায়েতপুর থানায় একজন অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ কনস্টেবল মারা গেছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই সময় অন্তঃসত্ত্বা কনস্টেবল থানাতেই ছিলেন না। থানার ছয়জন নারী পুলিশের মধ্যে তিনজন নারী সে সময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। হামলাকারীদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচাতে অন্তঃসত্ত্বা হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। ঘটনার পর টানা ৬ দিন থানার কোনো কার্যক্রম চলেনি। এরপর প্রায় ১ মাস কোনো রকম চলার পর সংস্কার করে থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করা হয়।

সেই সময় কর্মস্থলে থাকা থানার পুলিশ পরিদর্শক শাহিনুর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনার দিন রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রথমে এনায়েতপুর কেজির মোড় এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল এসে থানার মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এরপর আমরা অনুরোধ করলে তারা এলাকা ছেড়ে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরে আবারও একটি মিছিল এসে থানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। কিন্তু অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয়নি। এরপর হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যান। এর বেশ কিছুক্ষণ পর দুপুর ১টার দিকে একটি বড় মিছিল নিয়ে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে থানার ভেতরে ঢুকে হামলা চালায়। একপর্যায়ে আমরা তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইলেও তারা চার থেকে পাঁচ হাজার লোক থানার চারপাশের এলাকা ঘিরে আক্রমণ চালায়।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিক্ষোভকারীরা প্রথমে থানায় ঢুকে কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়ে মূল ফটকে অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় থানা কার্যালয়ের নিচতলায় থাকা আমরা ৯ পুলিশ সদস্য কৌশলে ভবনের ছাদের উপরে গিয়ে পানির ট্যাংকের নিচে লুকিয়ে যাই। হামলাকারীরা প্রথমে থানা কার্যালয়ের নিচতলায় মূল ফটকে অগ্নিসংযোগ করায় আর উপরে ওঠেনি। আমরা সেই পানির ট্যাংকের নিচে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করতে থাকি। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও দীর্ঘ সময় কোনো উদ্ধার তৎপরতা শুরু না করায় তাদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা ধরেই নেন তাদের অন্যদের মতো মেরে ফেলা হবে। পরবর্তী সময়ে সন্ধ্যায় সেনা সদস্যদের গাড়ির হুইসেল শুনে আমরা সেখান থেকে বের হই। তাদের কাছে সাহায্য চাইলে তারা আমাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যদের সবাই শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত ছিল।

Sirajgonj2

থানার পাশের বাসিন্দা মালা বেগম বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার সামনে পুলিশের গুলিতে বেলকুচির কলেজছাত্র শিহাব হোসেন, এনায়েতপুরের মাদরাসাছাত্র ও মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ সিয়াম হোসেন ও ব্যবসায়ী ইয়াহিয়া হোসেন শহীদ হওয়ার পরই আন্দোলন আরও ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে থানায় হামলা করে। তিনি নিজের জীবনবাজি রেখে তিনজন পুলিশ সদস্যের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেছেন। তিনজন পুলিশ সদস্যকে পোশাক পরিবর্তন করে নিরাপদ হেফাজতে রাখেন। দীর্ঘ সময় পর হামলাকারীরা চলে গেলে তাদের বাড়ি হতে বের করে দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলাকারীদের অধিকাংশের বয়স ১৭ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে দু-একজনের বয়স ৪০-৪৫ হবে। তবে তারা কেউই স্থানীয় নয় এবং সবাই তাদের অপরিচিত।

বেঁচে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল মালেক সে দিনের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেন, তিনি পরিবারের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিলেন। আব্দুল মালেক প্রাণে রক্ষা পেলেও থানার অফিসার ইনচার্জসহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে ঘটনার দিন থানার আশপাশে ১৩ জন পুলিশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত একজনকে থানার পাশে বাজারে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

পুলিশ হত্যায় মামলা ও গ্রেফতার

এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যার ঘটনায় ওই বছর ২৬ আগস্ট একটি হত্যা মামলা হয়। এতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের স্থানীয় চারজন নেতা এবং অজ্ঞাত পরিচয় ৫/৬ হাজার জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছিল এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চুকে। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন।

এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যার এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে সিরাজগঞ্জের আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কারাগারে ছিলেন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস পুলিশ হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার হয়ে এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

এনায়েতপুর থানার বর্তমান ওসি তদন্ত ফরিদুল ইসলাম জানান, সেদিনের ঘটনায় নারী পুলিশ সদস্যরা জীবন বাঁচাতে কৌশল অবলম্বন করেছিল। তার বর্ণনা মতে, এনায়েতপুর থানায় হামলার দিন মোট ৫৭ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। এর মধ্যে ৩ জন ছিলেন নারী কনস্টেবল। বেঁচে যাওয়া একজন নারী কনস্টেবলসহ থানায় আগুন দেওয়ার সময় দুজন নারী পুলিশ সদস্য থানার ভেতর ছিলেন। নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা কনস্টেবল ছিলেন- এমন আলোচনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। থানার ছয়জন নারী পুলিশের মধ্যে তিনজন নারী সে সময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। হামলাকারীদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচাতে এক সহকর্মী কনস্টেবল তাকে অন্তঃসত্ত্বা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

পুলিশ হত্যাকাণ্ডে কি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে -এমন প্রশ্ন করলে এনায়েতপুর থানা পুলিশের ওসি জানান, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সব জানিয়ে দেওয়া হবে। এ মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। বাকিরা পলাতক রয়েছেন।

Sirajgonj3

দুই বছরেও কেন এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে না-জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা চাই না কোনো নির্দোষ বা নিরীহ মানুষের সাজা হোক বা বিচারের আওতায় আসুক। আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। আপনারা যারা সাংবাদিক আছেন, আমাদের সাহায্য করেন, ভিডিও ফুটেজ যদি থাকে আমাদের দেন। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করব।

সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যা মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, এনায়েতপুর হত্যাকাণ্ডে চারটি মামলা হয়েছিল। একটি পুলিশ হত্যা মামলা, বাকি তিনটি আন্দোলনকারী হত্যা মামলা। পুলিশ হত্যা মামলায় ৯ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা সবাই ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কি না এ প্রশ্নে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দাবি করেন- মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হয় না।

এদিকে এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যার যে মামলাটি হয়েছে সেই মামলার বাদী হিসেবে স্বাক্ষর আছে এসআই আব্দুল মালেকের। মামলার বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, রাষ্ট্র যেভাবে দেখে সেটাই। আমার আর কী বলার আছে। আমি বলছিলাম আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না। কোথায় স্বাক্ষর করতে হবে বলেন। মানসিকভাবে মর্মাহত ছিলাম। এজাহার ওনারা লিখেছিল। আমি বলছিলাম- স্যার আমার কী করা লাগবে বলেন। আমি স্বাক্ষরটা করেছিলাম।

সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু ঢাকা মেইলকে বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট একটি মামলা পুলিশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। মামলায় বেশ কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছেন। মামলাটি নিয়মিত আছে এবং পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য অগ্রগামী আছে। এছাড়া থানার কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে।

প্রতিনিধি/জেবি