জেলা প্রতিনিধি
০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপালে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী হামলা ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অস্ত্রধারীদের গুলিতে সেদিন অন্তত সাতজন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হন।
দেশজুড়ে আলোচিত সেই ঘটনার পর ফেনীতে সাতটি হত্যা ও ২২টি হত্যাচেষ্টা মামলায় প্রায় আড়াই হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এরই মধ্যে ১৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়লেও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে এখনো শঙ্কা কাটেনি নিহতদের স্বজন ও মামলার বাদীদের।
আসামি তালিকা ঘিরে ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ, অতিরিক্ত সংখ্যক আসামি, দুর্বল চার্জশিট এবং ঘটনায় জড়িত নন-এমন ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার মতো নানা অসঙ্গতির বিষয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজরেও এসেছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৪ আগস্ট দেশব্যাপী এক দফার আন্দোলনে উত্তাল ছিল ফেনী। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সেদিন বেলা ১১টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে অবরোধ সৃষ্টি করে। এসময় শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মহিপালসহ আশপাশের এলাকা। দুপুর দেড়টার দিকে মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জামাতে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন আন্দোলনকারীরা। ঠিক এমন মুহূর্তে ফেনীর ট্রাংক রোড থেকে অস্ত্র-গুলি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে দুই শতাধিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী মহিপালে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও হামলা চালায়। এতে সাতজনের মৃত্যু ও পাঁচ শতাধিক ছাত্রজনতা গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো দেশজুড়ে আন্দোলনকারীরা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
জুলাই যোদ্ধা আবু জাফর বলেন, সেদিন মহিপালে আমরা আহত হওয়ার পর হাসপাতালেও যেতে দেওয়া হয়নি। ডায়াবেটিস হাসপাতালে আন্দোলনকারীরা চিকিৎসা নিতে গেলে পুনরায় হামলা করে নিজাম হাজারীর গুন্ডা বাহিনী। সেদিন সদর হাসপাতালেও বারবার গুলিবিদ্ধ ও আহত ভাইদের ওপর হামলার চেষ্টা চালানো হয়।

ফেনী জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেন, ২টার দিকে হঠাৎ আমাদের কাছে ফোন আসে মহিপালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হচ্ছে। হাসপাতাল প্রস্তুত রাখতে। কিছুক্ষণ পরেই দেখি একটার পর একটা লাশ আসছে। রক্তভেজা রিকশা ও সিএনজি থেকে নামানো হচ্ছে শত শত হতাহত দেহ। সেদিন হাসপাতালের শুধু জরুরি বিভাগই নয়; হাসপাতালের প্রাঙ্গণ ও আশপাশে আমরা যেভাবেই পেরেছি; সেভাবেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তখনকার অবস্থা এমন ছিল যে, অনেক আহত ও নিহত ব্যক্তির নাম ঠিকানাও আমরা তালিকাভুক্ত করতে পারিনি।
ফেনী মডেল থানার তথ্য বলছে, ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে হামলার ঘটনায় ৭টি হত্যা মামলা ও ২২টি হত্যা চেষ্টা মামলা রেকর্ড হয়েছে। এসব মামলায় এজহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ২ হাজার ৫০৫ জন হলেও অজ্ঞাতসহ আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ হাজার জনে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ১৯২ জন। যার মধ্যে এজহারভুক্ত মাত্র ২২৩ জন। গ্রেফতারকৃতদের মাঝে অল্প কয়েকজন ছাড়া বাকিরা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত রয়েছেন।
এসব মামলায় অন্যতম আসামিরা হচ্ছেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী, আলাউদ্দিন নাসিম, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, শিরিন আখতার। এছাড়াও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ছয়টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পাঁচ পৌরসভার মেয়র এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের আসামি করা হয়েছে।
চার্জশিটে আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত রাখা ও বাদ দেওয়া নিয়ে পুলিশ ও বিএনপি-জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠেছে। কিছু কিছু মামলায় ব্যক্তিগত আক্রোশে শিকার ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে এবং অভিযোগপত্রেও নাম রেখে দেওয়া হয়েছে। এজহারেও ছিল প্রবাসে থাকা এবং মৃত ব্যক্তির নাম। পুলিশের বিরুদ্ধেও বাদীর সঙ্গে যোগসাজশ করে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে। বিএনপি নেতাকে আওয়ামী লীগ নেতা বানিয়ে মামলা করার মতো ঘটনাও ঘটছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাগুলোতে অধিকসংখ্যক আসামি এবং তুলনামূলক দুর্বল এজাহার হওয়ায় তদন্ত কাজে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্বল্প সময়ে এত অধিক আসামির বিষয়ে তদন্ত করা একটি দুঃসাধ্য কাজ। তারপরও পুলিশ যতটুকু পেরেছে দ্রুততার সাথে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে।
জুলাই যোদ্ধা ও সংগঠক মুহাইমিন তাজিম ঢাকা মেইলকে বলেন, ৪ আগস্ট মহিপালে আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। আমাদের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলার সময় ৩০ থেকে ৪০ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর হাতে ভারী অস্ত্র ছিল। যার ফুটেজ এখনো প্রকাশ্যে রয়েছে। প্রশাসন এখন পর্যন্ত মাত্র ২ জন অস্ত্রধারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও বাকিদের আইনের আওতায় আনতে তেমন কোনো অভিযান ও প্রচেষ্টা আমাদের নজরে আসছে না।
ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গাজী ফৌজুল আজিম ঢাকা মেইলকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের মামলাগুলোর বিষয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে আমরা ৬টি হত্যা মামলা এবং ৭টি হত্যা চেষ্টা মামলাসহ ১৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছি। এসব মামলায় ২ হাজার ১৩৮ জন আসামি অভিযোগপত্রভুক্ত করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, চিহ্নিত আসামিদের অনেকেই অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ করেছে। যার কারণে তাদের হদিস পাচ্ছে না পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তুলনামূলক যারা অপরাধে তেমন সম্পৃক্ত ছিল না তারাই এখন মামলায় গ্রেফতার হচ্ছে।
ফেনীর আদালতের পিপি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকট মেজবাহ উদ্দিন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ফেনীতে জুলাই আন্দোলনের সময়ের মামলাগুলো তদন্তের পর পুলিশের দেওয়া ১৩ মামলার চার্জশিট থেকে ২টি মামলার ইতোমধ্যে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে টমটম চালক সবুজ হত্যা মামলার সাক্ষ্য চলছে এবং শিহাব হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিনক্ষণ ধার্য রয়েছে।

এদিকে ফেনীতে গণঅভ্যুত্থানকালের মামলায় আসামির সংখ্যার আধিক্য, দুর্বল চার্জশিট ও ঘটনায় জড়িত না থাকা ব্যক্তিদের জড়ানোসহ নানা অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি)। ট্রাইব্যুনালের আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করে সম্প্রতি ফেনী জেলা আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান ও মামলাগুলোর বাদী পক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঞাকে ঢাকায় ডেকে পাঠান। এরপর মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জুলাই শহীদ শিহাব উদ্দিনের পিতা নেছার উদ্দিন বলেন, কে দেশের ক্ষমতায় আসবে বা আসবে না সেটা নিয়ে আমাদের কিছু আসে যায় না। পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা মামলার আসামিদের নিয়ে যা করছে সেটাও আমি বলতে চাই না। আমি আমার সম্ভাবনাময় সন্তানটি হারিয়েছি। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। খুনিদের ফাঁসি চাই।
প্রতিনিধি/জেবি