জেলা প্রতিনিধি
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
মাথার ওপর ঝুলছে স্পন্দিত বিদ্যুতের উচ্চমানের তার, ঠিক তার ওপরই ধীরে ধীরে ভর করছে এক বিশালাকার কড়ই গাছ। শিকড় নরম হয়ে ধসে পড়ছে মাটি, আর ক্রমেই বাঁকা হয়ে নেমে আসছে রাস্তার ওপর। রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের লক্ষীকোল বেরী বাঁধ সড়কের এই চিত্র কোনো রূপকথার গল্প নয়, বরং শত শত পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিদিনের আতঙ্কের নাম।
দীর্ঘদিন ধরে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা এই গাছটি সরাতে স্থানীয়রা বারবার কড়া নাড়ছেন সংশ্লিষ্ট দফতরে। তবে অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের ‘ঠেলাঠেলি’ আর উদাসীনতার কারণে গাছটি সরেনি। ফলে যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে প্রাণঘাতী কোনো বড় দুর্ঘটনা।
স্থানীয়রা বলছেন, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে লক্ষীকোল বেরী বাঁধ এলাকার মাটি নরম হয়ে গেছে। এতে করে কড়ই গাছটির গোড়ার মাটি আলগা হয়ে এটি আরও বেশি রাস্তায় ঝুঁকে পড়েছে। বর্তমানে গাছটি সম্পূর্ণ ভর দিয়ে রয়েছে বিদ্যুতের মূল সঞ্চালন লাইনের তারের ওপর।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, গাছের অতিরিক্ত ভারে যে কোনো সময় বৈদ্যুতিক খুঁটি (পিলার) উপড়ে পড়ে পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা প্রাণহানি। শুধু বৈদ্যুতিক বিপদই নয়, বেরী বাঁধ সড়কে যানবাহন চলাচলেও চরম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে হেলে পড়া এই গাছটি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গাছটি এতটা নিচে নেমে এসেছে যে ভারী বা বড় কোনো যানবাহন ওই পাশ দিয়ে অনায়াসে পার হতে পারে না। এক পাশের গাড়ি থামিয়ে অন্য পাশের গাড়িকে পাড় হওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়। অসাবধানতাবশত গাছের ডালপালার সাথে ধাক্কা লেগে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ছোটোখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গাছটির ঠিক নিচে রাস্তার পাশে বসবাসকারী একটি পরিবারের জন্য। রাত নামলেই তাদের চোখে ঘুম থাকে না। সামান্য বাতাস বা বৃষ্টি হলেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটছে পরিবারটির। পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘গাছটি যদি ঘরবাড়ির ওপর ভেঙে পড়ে, তবে আমাদের বেঁচে থাকার কোনো পথ থাকবে না।’
বাসিন্দা শেফালী বেগম বলেন, ‘প্রতিটা রাত আমরা চরম আতঙ্কে পার করি। সামান্য একটু বাতাস বা বৃষ্টি হলেই মনে হয়— এই বুঝি বিশাল কড়ই গাছটা আমাদের মাথার ওপর ও ঘরের চালে ভেঙে পড়ল!’
তিনি বলেন, ‘গাছের ভারে বিদ্যুতের তার আর খুঁটি যে কীভাবে টিকে আছে, প্রভুই জানেন। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে প্রাণহানি হলে তার দায় কে নেবে? আমরা কর্মকর্তা-প্রশাসন সবার কাছে হাত জোর করে অনুরোধ করছি- গাছটা দ্রুত কেটে আমাদের এই মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচান।’
মোটরসাইকেল চালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই বেরী বাঁধ সড়ক দিয়ে চলাফেরা করা এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূর থেকে হঠাৎ দেখলে বোঝার উপায় থাকে না যে গাছটা কতটা নিচে হেলে আছে। বিশেষ করে রাতের বেলা বা বৃষ্টির সময় এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় গা শিউরে ওঠে। তারের সাথে ঝুলে থাকা গাছের ডালে ধাক্কা লেগে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা বাইক চালকরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে বাইক চালাই।’
ভ্যান চালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ভ্যানে উঁচু কোনো মালপত্র নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে পার হওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গাছটা রাস্তার অনেকটা অংশ জুড়ে নিচে নেমে থাকায় ভ্যান চালানো খুব কঠিন হয়। বাধ্য হয়ে রাস্তার উলটো পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু ওই পাশে অন্য কোনো গাড়ি চলে এলে মাঝরাস্তায় আটকে পড়ে থাকতে হয়। এতে আমাদের সময়ও নষ্ট হয়, আবার দুর্ঘটনার ভয়ও থাকে।’
অটোরিকশা চালক রমিজ বলেন, ‘অটোরিকশায় যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় প্রতি মুহূর্তে ভয়ে থাকতে হয়। গাছটা এমনভাবে বিদ্যুতের তারের ওপর হেলে আছে যে কোনো দিন তার ছিঁড়ে পড়তে পারে! তাছাড়া সামনের দিক থেকে কোনো বড় গাড়ি এলে রাস্তা এতই ছোট হয়ে যায় যে এক গাড়ি থামিয়ে অন্য গাড়িকে পার হতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকবার বলতে বলতে আমরা ক্লান্ত, প্রশাসন কেন যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার অপেক্ষা করছে বুঝি না!’
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় সচেতন মহল। বিষয়টি একাধিকবার বন বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি বলেও জানান তারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের কাজ কিছু না হলেও গাছে একটি 'বিপজ্জনক' লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। তাই অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ গাছটি অপসারণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।
যোগাযোগ করা হলে রাজবাড়ী সামাজিক বনায়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. শাহিদুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘গাছটি হেলে পড়ার খবর আমরা পেয়েছি এবং সেটি যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে আমরা অবগত।’ তবে গাছটি কবে নাগাদ কেটে পুরোপুরি অপসারণ করা হবে- এ বিষয়ে এই কর্মকর্তা কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
প্রতিনিধি/এএম