জেলা প্রতিনিধি
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
হবিগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত উপজেলা শায়েস্তাগঞ্জে একের পর এক চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। এবার পৌরসভার দক্ষিণ লেঞ্জাপাড়া এলাকায় অস্ত্রের মুখে এক নারীকে জিম্মি করে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রোববার (২ আগস্ট) সকালে শরীরচর্চার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী পারুল বালা দক্ষিণ লেঞ্জাপাড়া গ্রামের আনোয়ার আলীর ভাড়াটিয়া এবং পুলিশ কনস্টেবল নারায়ণের মা বলে জানা গেছে। প্রতিদিনের মতো রোববার সকালে তিনি শরীরচর্চার জন্য বের হন। এ সময় পথিমধ্যে দুর্বৃত্তরা তাকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে। পরে তার কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিয়ে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে বিষয়টি শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশকে অবগত করা হয়। পরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেকেই শায়েস্তাগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে দিনের বেলায় একজন নারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও তীব্র হয়েছে।
এ বিষয়ে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শায়েস্তাগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন, এসির মূল্যবান তামার তারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও বাসাবাড়ি, কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও চলাচলের পথে সাধারণ মানুষ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটির পর একটি ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শায়েস্তাগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কতটা?
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় সন্ধ্যার পরও মানুষ নির্বিঘ্নে বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করলেও বর্তমানে অনেকেই নির্জন সড়ক, অলিগলি কিংবা কম আলোযুক্ত এলাকায় চলাচলের সময় সতর্ক থাকছেন। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও একা চলাচলকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি।
সকালের ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটির জন্য যারা নিয়মিত বাড়ি থেকে বের হন, তারাও এখন নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। দক্ষিণ লেঞ্জাপাড়ার সর্বশেষ ঘটনাটি তাদের সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শায়েস্তাগঞ্জে চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধের পেছনে মাদকের একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে বলে তারা মনে করছেন। উপজেলা ও পৌর শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মাদকদ্রব্য বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একটি শ্রেণির মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়রা বলছেন, মাদকের বিস্তার রোধ করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কারণ মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে।
তবে মাদক বিক্রি ও সাম্প্রতিক চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
শায়েস্তাগঞ্জ শুধু একটি উপজেলা শহর নয়, এটি হবিগঞ্জ জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, রেলপথ ও স্থানীয় সড়ক যোগাযোগের কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ এলাকা দিয়ে চলাচল করেন।
এখানে উপজেলা প্রশাসন ছাড়াও রয়েছে শায়েস্তাগঞ্জ থানা, হাইওয়ে থানা, র্যাব ক্যাম্প, রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি, শিল্প পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতির পরও যদি চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ড অব্যাহত থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল জোরদার করা হচ্ছে কি না, মাদক বিক্রির স্থানগুলোতে নজরদারি রয়েছে কি না এবং চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত পুরনো অপরাধীদের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি রাখা হচ্ছে কি না।
তাদের মতে, শুধু কোনো একটি ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত পুলিশি টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আবাসিক এলাকা, বাজার ও রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলেছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, রাতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশি টহল দৃশ্যমান করা হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। পাশাপাশি দিনের বেলাতেও জনবহুল ও আবাসিক এলাকার আশপাশে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে মোটরসাইকেল চুরি, মোবাইল ছিনতাই, বৈদ্যুতিক ও এসির তামার তার চুরি এবং পথচারীদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় কোনো চক্র সক্রিয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সর্বশেষ পারুল বালার কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা ও এলাকায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন চুরি-ছিনতাইয়ের কথা তুলে ধরছেন। কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা দাবি করেছেন। আবার অনেকে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সর্বশেষ ছিনতাইয়ের অভিযোগের বিষয়ে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি মো. আবুল কালাম বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে।
একইসঙ্গে গত কয়েক মাসে শায়েস্তাগঞ্জে সংঘটিত চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে এগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অপরাধীদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয়দের মতে, চুরি-ছিনতাই বন্ধের পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। কোথা থেকে মাদক আসছে, কারা বিক্রি করছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের একটি অংশকে বিপথগামী করছে। মাদকাসক্তদের একটি অংশ অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে ছোটখাটো চুরি থেকে শুরু করে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শায়েস্তাগঞ্জের বাসিন্দাদের মূল দাবি, তারা নিরাপদ পরিবেশে বসবাস ও চলাচল করতে চান। দিনের বেলায় একজন নারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হয়ে না থাকে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, একটি এলাকায় অপরাধ বাড়তে থাকলে মানুষের মধ্যে প্রথমে আতঙ্ক তৈরি হয়, এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি।
তারা আরও বলেন, শায়েস্তাগঞ্জে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। এসব বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো গেলে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এখন প্রশ্ন, অস্ত্রের মুখে নারীকে জিম্মি করে স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাইয়ের অভিযোগের ঘটনায় জড়িতরা কবে আইনের আওতায় আসবে? একইসঙ্গে শায়েস্তাগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা চুরি-ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের লাগাম টানতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন আতঙ্কিত পৌরবাসী।
এএইচ