জেলা প্রতিনিধি
২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণ শেষ হয়েছে আট বছর আগে। উদ্বোধনের সময় মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পৌরবাসীর ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শোধনাগারের মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, পৌরসভার প্রায় দুই লাখ মানুষ এখনও আয়রন, ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।
৩৭ জেলা শহর পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার ছাগলফার্মপাড়ায় ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। পরে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। প্রকল্পটি হস্তান্তরের পরও তা চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০২০ সালে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৮০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি ওভারহেড পানির ট্যাংক নির্মাণ করা হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

বর্তমানে পৌরসভার ১৪টি পাম্প হাউস থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরবরাহ করা পানি অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত, হলদেটে, দুর্গন্ধযুক্ত এবং খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অনুপযোগী। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ফিল্টার ব্যবহার করছে, আবার কেউ কেউ বাজার থেকে বিশুদ্ধ পানি কিনে ব্যবহার করছেন। ইতোমধ্যে নিম্নমানের পানি সরবরাহের কারণে এক হাজারেরও বেশি গ্রাহক পৌরসভার পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।
শোধনাগারটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সুইস ভালভ, মোটর, ফিল্টার, পাইপ, রিজার্ভ ট্যাংক, পাম্প গ্যালারি, জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। স্টাফ কোয়ার্টার ও ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। চারপাশ আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গিয়ে পুরো এলাকা এখন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কোটি টাকার এই স্থাপনা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে।

পৌরসভার তথ্যমতে, এই পানি শোধনাগার থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৩৫০ ঘনমিটার এবং প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ঘনমিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন সম্ভব। এতে পৌরসভার মোট পানির চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করা যেত। বর্তমানে সাড়ে ৬ হাজার গ্রাহকের দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ঘনমিটার। পৌর এলাকায় পানি সরবরাহের জন্য রয়েছে ১১৩ কিলোমিটার পাইপলাইন। কিন্তু আধুনিক শোধনাগারটি চালু না থাকায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের সময় এক সপ্তাহের মধ্যে সুপেয় পানি সরবরাহের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আট বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে একদিকে যেমন জনগণের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে প্রতিদিন অনিরাপদ পানি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে। তাদের দাবি, দ্রুত পানি শোধনাগারটি চালু করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন প্রকল্পটি অচল থাকার কারণ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।

পৌর বাসিন্দা অ্যাডভোকেট কাইজার হোসেন জোয়ার্দ্দার বলেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অপরিষ্কার, অনিরাপদ পানি এই দুটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরে চুয়াডাঙ্গা পৌরবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর একই সমস্যার মধ্যে বসবাস করছি আমরা। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হলেও তা চালু না হওয়ায় জনগণ কোনো সুফল পাচ্ছে না। দ্রুত শোধনাগারটি চালু করে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পৌর বাসিন্দা শহিদ হোসেন বলেন, পৌরসভার পাইপলাইনে যে পানি আসে, তা খাওয়ার তো দূরের কথা, অনেক সময় ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পানিতে অতিরিক্ত আয়রন, ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে। এত বড় একটি পানি শোধনাগার বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে রয়েছে, অথচ এটি চালু হলে আমরা নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার সুযোগ পেতাম। এটি শুধু আমার নয়, পুরো পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা। আমাদের দাবি দ্রুত শোধনাগারটি চালু করে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনিছুজ্জামান বলেন, পানি শোধনাগারটি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। এটি চালু রাখা ব্যয়বহুল। এই একটি শোধনাগার দিয়ে যে পরিমাণ পানি উৎপাদন হবে, তা দিয়ে পুরো পৌর এলাকার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। আরও তিন থেকে চারটি শোধনাগার অথবা নতুন করে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আলাদা লাইন স্থাপন করতে হবে। এছাড়া লোকবল সংকটও রয়েছে। বিষয়টি আমরা বিভিন্ন সভায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।
প্রতিনিধি/টিবি