জেলা প্রতিনিধি
২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
ভাঙনের ভয়ে রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারি না। একুটখানি বসতভিটা আছে। তাও যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে কি করব? এর আগে আমাদের দুইটা ঘর নদীতে চলে গেছে, একটা ভাঙনের মুখে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে আতঙ্কে আছি। ওরা ভয়ে রাতে ঠিকমত পড়তে বসতে পারে না। পানির প্রচুর স্রোত, ডাক দেয়। বসতঘরটা নদীতে নিয়ে গেলে কোন জায়গায় কুঁড়েঘর বানবো। একটা গরু পুষি, তাও বাইন্ধে রাখার মতো জায়গা নেই। পরের জায়গায় রাখি। আমাদের একটাই দাবি, নদী বাইন্ধে দেন, গ্রামটা রক্ষা করেন— এ ভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রোজিনা বেগম।
এ চিত্র নড়াইলের নড়াগাতী থানার মাউলি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে। নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে গ্রামটিতে ১০ বছর ধরে ভাঙছে বসতবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি। কিন্তু ভাঙনরোধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাই দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসী।

শুধু রোজিনা বেগমই নন, ইসলামপুর গ্রামের ভুক্তভোগীদের অনেকে নবগঙ্গা নদী গর্ভে ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর ও ফসলি জমির স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীর ওপারে চলে গেছে। প্রায় ১০ বছর ধরে ভাঙতে ভাঙতে নদীর ওপারে আমাদের স্মৃতিচিহ্ন জেগে উঠেছে। কিছু জমি চরে ভেসে উঠেছে। তাই ইসলামপুর গ্রামের অবশিষ্ট বাড়িঘর, গাছপালা ও ফসলি জমি রক্ষায় ভাঙনরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসী।
ইসলামপুর গ্রামের আতিয়ার মোল্যা বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে ইসলামপুর পূর্বপাড়া নবগঙ্গা নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। ভাঙনের কারণে অনেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পে চলে গেছেন। অনেকে ভাড়াবাসায় আছেন। এমপি যদি আমাদের নদী ভাঙনের কাজটা দ্রুত করে দেয়, তাহলে খুব ভালো হবে।

আতিক কাজী বলেন, মাউলি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের অনেক বাড়ি ভেঙে গেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আরও ৮০ থেকে ৯০টি বসতবাড়ি এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নবগঙ্গা নদীভাঙনের হুমকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় আজগর মোল্যা বলেন, নদী ভাঙনের কারণে আমার দুই চাচা এখান (ইসলামপুর) থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমার জমি ভাঙছে। আমাদের প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাঙন প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। তা না হলে এখানে থাকাই কষ্টের ব্যাপার।

বৃদ্ধ খাজা ফকির বলেন, নদী ভাঙনের কবলে ইতোমধ্যে ৬০টি বাড়িঘর ভেঙে গেছে। আমাদের নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমসহ সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে বলবো, ‘ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আমাদের গ্রামটা রক্ষা করুন, ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নিন।’
নড়াইলের নড়াগাতী থানার মাউলি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে গ্রামটিতে ১০ বছর ধরে ভাঙছে বসতবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি। কিন্তু ভাঙনরোধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাই দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসী।
বৃদ্ধা ময়না বেগম বলেন, এখানকার বসতভিটা ছাড়া আমাদের আর কোথাও বাড়িঘর করার মতো জায়গা জমি নেই। আমাদের এইসব বসতভিটা নদীতে চলে গেলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। আমরা গরিব মানুষ।

এদিকে, ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থার নেওয়ার দাবিতে সম্প্রতি (৩ জুলাই) ভাঙনকবলিত নদীপাড়ে মানববন্ধনও করেছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসী। তারা জানান, ভাঙন আতঙ্কে রাতে ঠিকমত ঘুমাতেও পারেন না তারা। দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ ভাঙনের কারণে ইসলামপুর গ্রামের অর্ধশত বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে অনেকে ভূমিহীন হয়ে আশ্রয়ণ কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। অনেকে ভাড়াবাসায় আছেন। এদিকে, বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০টি বসতবাড়ি এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নবগঙ্গা নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাঙন প্রতিরোধের দাবি ভুক্তভোগী গ্রামীবাসীর।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজীৎ কুমার সাহা জানান, মধুমতি ও নবগঙ্গা অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ নদী। এসব নদী ভাঙন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি পাস হলে ভাঙন প্রতিরোধে আমরা কাজ করতে পারব। এছাড়া বর্ষা মওসুমে তাৎক্ষণিক ভাঙন প্রতিরোধে ঝুঁকি এলাকা বিবেচনায় আপদকালীন কাজের অংশ হিসেবে ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তুতি রয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষের বাড়িঘর ও মূল্যবান স্থাপনা রক্ষার চেষ্টা করা হয়। এবারের বর্ষা মওসুমেও আমাদের সেই প্রস্তুতি রয়েছে।
প্রতিনিধি/টিবি