জেলা প্রতিনিধি
২৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাত বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয়েছে ঐতিহাসিক নাজিরপুর যুদ্ধদিবস।
১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই নাজিরপুরে পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হওয়া সাত বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে রোববার (২৬ জুলাই) দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নেত্রকোনা জেলা ইউনিট কমান্ডের উদ্যোগে এবং উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সহযোগিতায় কর্মসূচির সূচনা হয় নাজিরপুর স্মৃতিসৌধ ও লেংগুরা ইউনিয়নের ফুলবাড়ি এলাকায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে।
এ সময় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বাংলাদেশ পুলিশের একটি চৌকস দল এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে শহীদদের রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে লেংগুরা বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ওয়াহিদুজ্জামান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামছুজ্জামান আসিফ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নেত্রকোনা জেলা ইউনিট কমান্ডের সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান তালুকদার, কলমাকান্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. খায়ের এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নেত্রকোনা জেলা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান। সঞ্চালনা করেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারি চাঁন মিয়া।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাইয়ের নাজিরপুর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য সাত বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ জাতির জন্য চিরস্মরণীয়। তাদের বীরত্ব ও আত্মদান নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ধারণে অনুপ্রাণিত করবে।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই সকালে দুর্গাপুরের বিরিশিরি থেকে পাকহানাদার বাহিনী কলমাকান্দার দিকে অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়ে কমান্ডার নাজমুল হক তারার নেতৃত্বে টাইগার কোম্পানির প্রায় ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা নাজিরপুর বাজারের বিভিন্ন প্রবেশপথে অ্যাম্বুশের প্রস্তুতি নেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর নিজ ক্যাম্পে ফেরার পথে নাজিরপুর কাছারির কাছে পাকবাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও একপর্যায়ে সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
শহীদরা হলেন—নেত্রকোনার আবদুল আজিজ ও মো. ফজলুল হক, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মো. ইয়ার মামুদ, ভবতোষ চন্দ্র দাস, মো. নূরুজ্জামান, দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস এবং জামালপুরের মো. জামাল উদ্দিন। তাদের ভারত সীমান্তসংলগ্ন কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়নের ফুলবাড়ি এলাকায় ১১৭২ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে সমাহিত করা হয়।
প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক নাজিরপুর যুদ্ধদিবস পালিত হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার চেতনা পৌঁছে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
প্রতিনিধি/এসএস