জেলা প্রতিনিধি
১৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
দেশের সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) বিকাশে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে সরকার। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। নিজস্ব এ জাহাজের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র ও সমুদ্রতলে থাকা জ্বালানি, গ্যাস হাইড্রেট, মূল্যবান খনিজ সম্পদ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মাণ হচ্ছে জাহাজটি। এর নকশা করেছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নকশা প্রতিষ্ঠান কিল মেরিন। আর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশ, চীন, তুরস্ক ও সিঙ্গাপুর থেকে। বোরি ও খুলনা শিপইয়ার্ডের মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুনে জাহাজটি বোরির বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথমবার নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা
বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনাময় সামুদ্রিক সম্পদের ভান্ডার হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামোর অভাবে এর প্রকৃত সম্ভাবনা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বোরির বিজ্ঞানীদের এত দিন সমুদ্র গবেষণার জন্য সাধারণ মাছ ধরার ট্রলার কিংবা বিদেশি গবেষণা জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে গবেষণা সীমাবদ্ধ ছিল উপকূলীয় অগভীর জলসীমায়। গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, জ্বালানি সম্পদ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে কার্যকর গবেষণা প্রায় অসম্ভব ছিল। নতুন গবেষণা জাহাজ সেই সীমাবদ্ধতা দূর করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভাসমান গবেষণাগারে থাকবে তিনটি আধুনিক ল্যাব
জাহাজটি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাসমান গবেষণাগার। এতে থাকবে ওয়েট ল্যাব, ড্রাই ল্যাব এবং ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাব।
সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা পানি, পলি, জীববৈচিত্র্যসহ বিভিন্ন নমুনা মাঝসমুদ্রেই তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা যাবে। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষণার তথ্য সরাসরি মূল ডেটা সেন্টারে পাঠানো সম্ভব হবে। জাহাজটিতে একসঙ্গে ২৩ জন বিজ্ঞানী ও ক্রু সদস্য অবস্থান করে টানা ৮ থেকে ১০ দিন ২৪ ঘণ্টা গবেষণা পরিচালনা করতে পারবেন।
গ্যাস হাইড্রেট ও খনিজ অনুসন্ধানে উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্র
জাহাজটিতে সংযোজন করা হচ্ছে সাব-বটম প্রোফাইলার, মাল্টিবিম ইকো সাউন্ডার এবং সাইড-স্ক্যান সোনারের মতো আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক যন্ত্র।
এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রতলের নিচের ভূতাত্ত্বিক গঠন, পলির স্তর, গ্যাস হাইড্রেটের সম্ভাব্য অবস্থান, মূল্যবান খনিজ সম্পদ এবং সমুদ্রতলের ত্রিমাত্রিক চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া সমুদ্রের পলি, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর নমুনা বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস, সমুদ্রের কার্বন সংরক্ষণক্ষমতা এবং সামুদ্রিক দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও গবেষণা করা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্য ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কক্সবাজারে নির্মাণ হচ্ছে জেটি ও পন্টুন
গবেষণা জাহাজটির কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে কক্সবাজার শহরের অদূরে খরুশকূলের মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় পন্টুন, জেটি ও গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া উপকূলীয় অগভীর এলাকা, মোহনা এবং জরুরি উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের দুটি উচ্চগতির স্পিডবোটও তৈরি করা হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এগুলো বোরির কাছে হস্তান্তর করা হবে। মূল গবেষণা জাহাজে রসদ সরবরাহ, নমুনা সংগ্রহ ও জরুরি সহায়তায় এগুলো ব্যবহার করা হবে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিবেশ, ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, "প্রচলিত দেশীয় নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে আমাদের গবেষণা মূলত উপকূলের কাছাকাছি এবং অগভীর পানিতেই সীমাবদ্ধ। ফলে সমুদ্রের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা কিংবা প্ল্যাংকটনের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের বাইরে গভীর সমুদ্র নিয়ে বড় ধরনের অনুসন্ধান করা সম্ভব হয় না।"
তিনি বলেন, "নতুন গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে আমরা প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতল এবং বিভিন্ন গভীরতার পানির স্তরে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করতে পারব। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার সক্ষমতা থাকবে এই জাহাজে। এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ, সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং সুনীল অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গবেষণা জাহাজ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো নয়; এটি দেশের সামুদ্রিক সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান ও টেকসই ব্যবহারের নতুন ভিত্তি তৈরি করবে।
গভীর সমুদ্রের প্রকৃত সম্পদ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি, খনিজ, সামুদ্রিক জীবসম্পদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমিকে আরও কার্যকর ও লাভজনক করে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিনিধি/এসএস