জেলা প্রতিনিধি
১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০২ পিএম
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দেশের অন্যতম বিরল বনজ পাখি কালো মথুরা বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। সম্প্রতি প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আনিস শেখ উদ্যানের গভীর অরণ্যে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কালো মথুরার দুর্লভ ছবি ধারণ করেন। ছবিটি প্রকাশের পর প্রকৃতিপ্রেমী, পাখি গবেষক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো মথুরা বাংলাদেশের অত্যন্ত বিরল আবাসিক বনমোরগ। ঘন চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বনাঞ্চলই এ পাখির প্রধান আবাসস্থল। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই এটি দ্রুত ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ফলে খালি চোখে দেখা যেমন কঠিন, তেমনি ক্যামেরাবন্দি করাও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
আলোকচিত্রী আনিস শেখ জানান, দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে বন পর্যবেক্ষণের পর সাতছড়ির একটি নিরিবিলি স্থানে তিনি পাখিটির দেখা পান। তখন সেটি বনপথের পাশে খাদ্যের সন্ধানে ব্যস্ত ছিল। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তিনি কয়েকটি দুর্লভ মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে সক্ষম হন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বনাঞ্চলে এমন বিরল প্রজাতির পাখির উপস্থিতি দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ সম্পদ রক্ষায় বন সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রকৃতিবিদদের মতে, পুরুষ কালো মথুরার শরীরে চকচকে নীলাভ-কালো পালক, মাথায় উজ্জ্বল লাল রঙের খোলা ত্বক এবং লম্বা সাদা-কালো মিশ্রিত লেজ থাকে, যা সহজেই অন্য বনমোরগ থেকে আলাদা করে চেনা যায়। বনজ ফল, বীজ, কচি পাতা ও ছোট পোকামাকড় এদের প্রধান খাদ্য।
প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে শতাধিক প্রজাতির পাখির পাশাপাশি উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনবিড়ালসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর বসবাস রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো মথুরার উপস্থিতি উদ্যানটির পরিবেশগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা জানান, অবৈধ গাছ কাটা, বনভূমিতে মানুষের অনুপ্রবেশ, শব্দদূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কালো মথুরাসহ অনেক বিরল বনজ পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারি জোরদার, দর্শনার্থীদের সচেতন করা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তাঁরা।
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী মাসুদ বলেন, কালো মথুরার এই উপস্থিতি শুধু একটি দুর্লভ আলোকচিত্রের বিষয় নয়, এটি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যানটির জীববৈচিত্র্য আগের তুলনায় আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। এ ধরনের বিরল প্রজাতির উপস্থিতি বন সংরক্ষণের ইতিবাচক ফলাফল তুলে ধরে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, সাতছড়ির মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিরল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এ ধরনের দুর্লভ আলোকচিত্র ভবিষ্যৎ গবেষণা, বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য মূল্যবান তথ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রতিনিধি/এসএস