জেলা প্রতিনিধি
১৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় কক্সবাজারের অন্যতম সম্ভাবনাময় মৎস্য খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জেলার প্রায় চার হাজার পুকুর ও ঘের তলিয়ে গিয়ে ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মাছ, চিংড়ি, পোনা ও পোস্ট লার্ভা (পিএল)। এতে শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাছচাষি সর্বস্বান্ত হওয়ার পাশাপাশি জেলার সামগ্রিক মাছ উৎপাদনেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, একই দুর্যোগে গত পাঁচ দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা, পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও পানিতে ডুবে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। বন্যা-পরবর্তী ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের পরিমাণ ৫ হাজার ২৫৪ একর। এতে ৭৬৮ জন মৎস্যচাষি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার পোনা এবং ২২১ লাখ পিস পোস্ট লার্ভা (পিএল)। এর মধ্যে মাছের ক্ষতির পরিমাণ ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, চিংড়িতে ১২ কোটি ৬২ লাখ টাকা, পোনায় ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং পিএলে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়া উপজেলা। সেখানে ৭৩০টি পুকুর ও ঘের, প্রায় ২ হাজার একর জলাশয় এবং ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে ৬৫২ মেট্রিক টন মাছ, ১৬২ মেট্রিক টন চিংড়ি, বিপুল পরিমাণ পোনা ও পিএল। জেলার মোট ক্ষতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয়েছে এই উপজেলায়।
এরপরই রয়েছে মহেশখালী, যেখানে ১০৫টি পুকুর ও ১ হাজার ৯৬৫ একর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ৩ লাখ টাকা, মাতামুহুরীতে ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, টেকনাফে ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং কক্সবাজার সদরে ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এছাড়া পেকুয়ায় ২ কোটি ১০ লাখ, ঈদগাঁওয়ে ১ কোটি ৫ লাখ এবং রামুতে ৪২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মহেশখালী উপজেলার মৎস্যচাষি শরীফুল আলম বলেন, অধিকাংশ পুকুরের বাঁধ ভেঙে মাছ পানির সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। কোথাও পুকুর কাদায় ভরে গেছে, আবার অনেক স্থানে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় এখনই নতুন করে পোনা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। যারা ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলেন, তাদের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ।

চকরিয়া উপজেলার মৎস্যচাষি মনির উদ্দিন বলেন, টানা বৃষ্টিতে পুকুরের বাঁধ ভেঙে গেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বছরের সব মাছ পানির সঙ্গে ভেসে গেছে। এখন পুকুরে শুধু কাদা আর বন্যার পানি। নতুন করে চাষ শুরু করতে হলেও পুকুর সংস্কার, পোনা ও খাদ্যের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, যা আমাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়।
উখিয়ার রাজাপালং এলাকার মাছচাষি মোহাম্মদ আলম বলেন, ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যার এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে। মাছ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের জরুরি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।
মহেশখালীর ধলঘাটা এলাকার চিংড়িচাষি নুরুল ইসলাম বলেন, ঘেরের চারপাশের বাঁধ ভেঙে চিংড়ি ও পোনা সব সাগরের পানিতে চলে গেছে। কয়েক মাসের পরিশ্রম একদিনেই শেষ হয়ে গেছে। এখন আবার ঘের মেরামত, পোনা সংগ্রহ ও খাদ্য কিনতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন।
পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া এলাকার মৎস্যচাষি জসিম উদ্দিন বলেন, বন্যার পানি নামলেও এখনই পোনা ছাড়া যাচ্ছে না। পুকুরে কাদা জমেছে, পানির মানও খারাপ। আগে পুকুর পরিষ্কার করতে হবে। ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য বিনামূল্যে পোনা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারব।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত পুনর্বাসন, ভর্তুকি মূল্যে পোনা ও মাছের খাদ্য বিতরণ, স্বল্পসুদে ঋণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর-ঘের পুনঃসংস্কারে সরকারি সহায়তা জরুরি। তা না হলে চলতি বছরের ক্ষতির প্রভাব আগামী মৌসুমের মাছ উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহের ওপরও পড়বে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।
এদিকে, কক্সবাজার সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত টানা বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা, পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও পানিতে ডুবে জেলায় ৩১ জনের মৃত্যু এবং ৪২ জন আহত হয়েছেন। দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ১৬টি উপজেলা ও ৭২টি ইউনিয়ন পর্যায়ের মোট ৮৮টি মেডিকেল টিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চিকিৎসাসেবা, রোগ নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ২ লাখ ৮৫ হাজার প্যাকেট ওরস্যালাইন, ৮ হাজার ৮৯০ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন, ১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭০টি জিংক ট্যাবলেট, ২৪ লাখ পানি বিশুদ্ধিকরণ ট্যাবলেট, ১৫ হাজার ৩৩৩ ব্যাগ নরমাল স্যালাইনসহ পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ মজুত রয়েছে। তবে সম্ভাব্য ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় অতিরিক্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে এবং ডায়রিয়া বা অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করা এবং শিশুদের বন্যার পানিতে চলাচল থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিনিধি/টিবি