জেলা প্রতিনিধি
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম
গত বছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি ফেনীর মানুষ। এরই মধ্যে ফেনীসহ দেশের পাঁচ জেলায় নতুন করে বন্যার পূর্বাভাসে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। উজানে টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। এতে বিশেষ করে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় কয়েক দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর প্রভাবে ফেনীর তিনটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত আরও বাড়লে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্বাভাস প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হয়েছে। অতিরিক্ত পানির চাপে এসব বাঁধ ভেঙে আবারও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। এতে ফসল ও প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, বন্যা পূর্বাভাস রয়েছে। অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফাহাদ্দিস হোসাইন জানান, মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার। মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত নদীগুলোর পানির উচ্চতা ছিল ৮ দশমিক ৯৭ মিটার। অর্থাৎ পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি আরও বাড়তে পারে। তিনি আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, নদীর পানির উচ্চতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তের ওপারের বৃষ্টিপাতের তথ্যও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। সরকারি হিসাবে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। বন্যায় ভেসে যায় গবাদিপশু, ফসল ও অসংখ্য ঘরবাড়ি। বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ত্রাণ কার্যক্রম তখন দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

এদিকে, ফেনীতে স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। স্থানীয়দের আশা, প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে জেলার দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিনিধি/এসএস