জেলা প্রতিনিধি
০২ জুলাই ২০২৬, ১২:১৩ পিএম
পর্যটননগরী কুয়াকাটার শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে কংক্রিটের (সিসি) ব্লক সরে যাওয়া ও দেবে যাওয়ায় ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কুয়াকাটা চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধের বিভিন্ন অংশে ব্লকের নিচ থেকে বালি ও মাটি সরে গিয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুম, জোয়ার কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুয়াকাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর দাখিল মাদরাসা-সংলগ্ন সানসেট পয়েন্ট এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আশিঘর এলাকার অর্কা পল্লী-সংলগ্ন অংশে অন্তত দুটি স্থানে সিসি ব্লক সরে গেছে। কোথাও কোথাও ব্লক দেবে গিয়ে বড় ফাটল ও ফাঁকা অংশ তৈরি হয়েছে। এতে শহর রক্ষা বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বর্ষা এলেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে ব্লকের নিচ থেকে বালি ও মাটি সরে যাওয়ায় একাধিক স্থানে ধসের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
কুয়াকাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জেলে রাসেল মিয়া জানান , আমরা খুবই চিন্তায় আছি। গত বছর একটি স্থানে ব্লক সরে গিয়েছিল। এবার পাশাপাশি আরও দুটি স্থানে একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ করা উচিত।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের দিকে জিও ব্যাগে বালি ভরে কুয়াকাটা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (সিইআইপি-১)-এর আওতায় ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পোল্ডার-৪৮ প্রকল্পের অধীনে বাঁধটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। এ প্রকল্পে কুয়াকাটা উপকূলে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার বাঁধ-কাম-সড়ক, স্লোপ প্রটেকশন এবং আধুনিক প্রযুক্তির একাধিক স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় শতকোটি টাকার বেশি। উপকূলীয় জনগণকে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা এবং পর্যটননগরী কুয়াকাটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়া, ধসে পড়া এবং মূল কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় নির্মাণমান ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, দ্রুত কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার না করলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও জনদুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে।
কুয়াকাটা ইসলামপুর দাখিল মাদরাসার সুপার সৈয়দ মো. ফারুক বলেন, অতীতে বেড়িবাঁধের বাইরের অন্তত ১০টি স্থান সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন বাঁধের ভেতরে থাকা স্কুল, মাদরাসা, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো সংস্কার করা জরুরি।
কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক ও হোটেল খান প্যালেস কুয়াকাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাসেল খান বলেন, বাঁধের ভেতরে শত শত হোটেল-মোটেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। বর্ষা ও বৈরী আবহাওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার না হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা দরকার।

কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি সৈকতের ভাঙন রোধে বিকল্প আরেকটি প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে। শহর রক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন
ফেনীর লেমুয়া-নবাবপুর ব্রিজ ধসের শঙ্কা, জনমনে আতঙ্ক
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াসীন সাদেক বলেন, শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/টিবি