জেলা প্রতিনিধি
২২ জুন ২০২৬, ১১:২৩ এএম
পলিনেট হাউজের ভেতরে মাচায় ঝুলছে থোকায় থোকায় আঙুর। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদ লেগে চকচক করছে টসটসে লাল আঙুর। এক পলক দেখলে মনে হবে, এ যেন বাংলাদেশের কোনো গ্রাম নয়, বরং ইউরোপের কোনো এক চোখজুড়ানো আঙুর বাগান! ‘দেশের মাটিতে চাষ করা আঙুর টক হয়’—বহু বছরের এই চেনা ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মিষ্টি আঙুরের বাম্পার ফলন ঘটিয়েছেন নাটোরের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আমজাদ হোসেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্য অবলীলায় তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে।
নাটোর শহরের কান্দিভিটুয়া এলাকায় দেড় বিঘা জমিতে পলিনেট হাউজে বাণিজ্যিকভাবে রাশিয়ান বাইকুনুরসহ তিনজাতের আঙুর চাষ শুরু করেছেন তিনি। তার মাচায় ঝুলছে থোকায় থোকায় টসটসে লাল-বেগুনি রঙয়ের আঙুর। সেই গাছের আঙুর প্রতিদিন দেখতে আসেন দর্শনার্থীরা। শখেরবশে কিনছেন চারা গাছও। নতুন আঙুরের বাগান করতে পরামর্শের জন্য আসছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তারা। অনেকে বাগান দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু করেছেন বাগান।

জানা গেছে, চার বছর আগে ইউটিউব দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে শখের বশে রাশিয়ান, ইউক্রেন, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ৩৬ প্রকার জাতের আঙুরের চারা সংগ্রহ করেন আমজাদ হোসেন। পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন তিনি। প্রথম বছরেই আঙুর চাষে সফলতা পান। ৩৬ জাতের মধ্যে বাইকুনুর, ভ্যারেজ, ডিস্কনসহ এ তিনটি জাত চাষে সফল হন। এসব আঙুর স্বাদে সুমিষ্ট। এর মধ্যে রাশিয়ান বাইকুনুর জাতটি সবচেয়ে ভালো ফলন হয়েছে। তার বাগানে ১০০টি মাতৃ গাছ রয়েছে। এ বছর ৩ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার আঙ্গুর বিক্রির আশা করছেন এ তরুণ উদ্যোক্তা।
চারা কিনতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, ইউটিউবে দেখে বাগানে এসে আমি অভিভূত। আঙুর চাষ বাংলাদেশও যে সম্ভব, তা না দেখলে বোঝা যাবে না। বাগানে থোকায় থোকায় লাল লাল আঙুর ঝুলছে। মনে হচ্ছে, বিদেশের কোনো আঙুর বাগানে এসেছি। আমিও চারা কিনতে এসেছি, ছাদে বাগান করবো।

হাবিবুর রহমান নামে এক দর্শনার্থী বলেন, অবিশ্বাস্য যে বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর ঝুলছে। বাগানে এসে, আঙুর দেখে বিশ্বাস করতে পারছি না, এই বাগানটা নাটোরে। এত বড় বড় আঙুরের থোকা দেখে আমি আশ্চর্য হয়েছে। বাজারে আঙুরের মতই খেতে মিষ্টি।
বাগান দেখতে আসা গৃহিণী আফরোজা আক্তার নুপুর বলেন, ফেসবুকে আমজাদ ভাইয়ের আঙুর ফলের বাগান দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ছাদে আঙ্গুরের বাগানের ইচ্ছায় চারা নিতে এসেছি। বাগানে এসে আমি অনেক আশ্চর্য হয়েছি, এত পরিমাণে আঙুর ধরেছে তার বাগানে। নিজ হাতে আঙ্গুর পেরে খেলাম। অনেক সুস্বাদু, বাজারের আঙুরের মতই স্বাদ।
তরুণ উদ্যোক্তা মো. আমজাদ হোসেন জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে আঙুর চাষ দেখে আমি উদ্বুদ্ধ হই। প্রাথমিকভাবে দেশ এবং দেশের বাহির থেকে আঙুরের ৩৬ জাত সংগ্রহ করি। রোপণের এক বছর পরই প্রায় প্রতিটি গাছে ফল আসে। তবে বাইকুনুর, ভ্যারেজ ও ডিস্কন জাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল ধরে। এ তিন জাতের ফলগুলো অনেক সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। পরবর্তীতে আমি বাণিজ্যিকভাবে মাতৃবাগান করি। এবছর এই তিন জাতের প্রতিটি গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল এসেছে। অনেক দর্শনার্থী বাগানে এসে ফল দেখে চারা কিনছেন। আশা করছি, এ বছর সাড়ে তিন লাখ টাকার আঙুর বিক্রি হবে। আমাদের দেশের বেকার যুবকরা বাণিজ্যিকভাবে এ জাতের আঙুর বাগান করতে পারেন। অনেকে আঙুরের বাগান করতে চারা ও পরামর্শ নিতে আসছেন।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান জানান, নাটোরের পরিবেশে এ জাতের আঙুর চাষ বেশ উপযোগী। তরুণ উদ্যোক্তা আমজাদ ২০ শতক জমিতে পলিনেট হাউজে বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষ করেছেন। বেশ ফলন এসেছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় পলিনেট হাউজের মাধ্যমে তিনি চাষ শুরু করেন। ফলের পাশাপাশি সারাদেশে চারাও বিক্রি করছেন। সেই চারা থেকেও ফল হচ্ছে, তা আমরা সরেজমিনে পরীক্ষা করেছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ জাতের আঙ্গুর চাষ হচ্ছে। বেকার যুবকরা বিদেশি এই আঙুর চাষ করে বেকারত্ব দূর করতে পারেন। অন্যদিকে দেশে উৎপাদিত আঙুর আমাদের পুষ্টির চাহিদা মিটাবে।
প্রতিনিধি/টিবি