জেলা প্রতিনিধি
২০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় খাল খনন প্রকল্পে কাগজে শ্রমিক থাকলেও বাস্তবে কাজ করা হচ্ছে এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে। এতে সহস্রাধিক শ্রমিক এ কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ণ খালসমূহ খনন, পুনঃখনন এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)-এর আওতায় এ উপজেলায় দুইটি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদনসহ বরাদ্দ পায়।
আরও জানায়, অনুমোদিত প্রকল্প এলাকায় অধিক পানি ও কৃষিজমি থাকায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্প দুটি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে অনুযায়ী সংশোধিত খাল খনন ও পুনঃখননের অনুমতির জন্য প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়।
সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী রামজীবন ইউনিয়নের ভবানীপুর ত্রাণের ব্রিজ হতে কেকৈ কাশদহ তালেরডিটা (কালিতলা) ল্যাংগা খাল পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৫০ মিটার খাল খননের অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা আছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এছাড়া শ্রীপুর ইউনিয়নের ডেলারায় মহাশ্মশান হতে দক্ষিণ শ্রীপুর সুইস গেট পর্যন্ত ৬ হাজার ৯০০ মিটার খাল খননের জন্য ২ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার টাকা।
দেখা গেছে, দুই প্রকল্প মিলে ১২টি ভেকু খননের কাজ করছে। রামজীবন ইউনিয়নে ৮টি এবং শ্রীপুরে ৪টি। ২ প্রকল্পে পুরুষ-মহিলা মিলে ১ হাজার ২৬৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা রয়েছে। এরমধ্যে রামজীবন ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬৬০ এবং শ্রীপুর ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬০৪ জন। প্রকল্প দুটি ঘুরে কোথাও কোনো শ্রমিক দেখা যায়নি। তাদের নাম কেবলমাত্র তালিকায় দেখা গেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, শ্রমিক দিয়ে কাজ করার কথা শুনেছি। তালিকাও করা হয়েছে। এখন দেখছি ভেকু দিয়ে খনন চলছে। কাজ যে খুব একটা ভালো হচ্ছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। এসব খাল খননে জনগণের কোনো উপকারে আসবে না। শুধু অফিসারের পাকেট ভারি হবে বলে ধারণা তাদের।
রামজীবন ইউনিয়নের বাওনি খালের পাশের বাসিন্দা মহির উদ্দিনের স্ত্রী জামিরন বেগম বলেন, সাতটি ভেকু মেশিন দিয়া মাটি কাটার কাম চলছে। কোনো কামলাক কাম করতে দেখি নাই হামরা। হামরা গরীব মানুষ। হামাকগুলাক দিয়া কাম কইললে ভালোই হইলো হয়। কিন্তু গরিবের হক ওমরা এখন মারি খাইবে।
খাল পাড়ের বাসিন্দা সুনীল চন্দ্র দাশ বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে জীবন-জীবিকার অবলম্বন এ খালটি। এক সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছ এখন অনেক কমে গেছে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি। তবে ভেকু দিয়ে খনন করায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এ বিষয়ে কথা হয় শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকা আনিছুর রহমান ও আবু বক্কর সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজনের সাথে। তারা বলেন, শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কথা বলে মাসখানেক আগে ভোটার আইডি ও মোবাইল নাম্বার নিয়েছেন। এর বেশিকিছু জানেন না তারা।
এ বিষয়ে কথা হয় শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজাহারুল ইসলাম বলেন, ভেকু দিয়ে মাটি খননের কাজ চলছে। পরে শ্রমিক দিয়ে করা হবে। এখানে চারটি ভেকু কাজ করছে। ইউএনও স্যারসহ আমিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।
রামজীবন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শামছুল হুদা সরকার ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমাকে একদিন এমপি মহোদয় এবং পিআইও ডেকেছিলেন এ বিষয়ে। বলেছিলেন শ্রমিক লাগবে মোট ৬৬০ জন। তালিকাও করেছি। কিন্তু তারা আর তালিকা নেননি। এখন দেখছি তারা খাল খননের কাজ ভেকু দিয়েই করছেন।
এ প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মশিউর রহমানের যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ ক্ষোভের সাথে বলেন, খাল খননের বিষয়ে ইউএনও বা পিআইও বিস্তারিত কিছুই বলেননি আমাদের। রামজীবন এবং শ্রীপুর ইউনিয়ন থেকে ১২৫ করে ২৫০ জন শ্রমিকের নাম চেয়েছেন মাত্র।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন এবং শ্রমিক দুটো দিয়েই কাজ করার অনুমতি নেয়া আছে। এখন ভেকু দিয়ে করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শ্রমিক দিয়ে বাকি কাজগুলো করা হবে।
স্থানীয় এমপি ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাজেদুর রহমান শ্রমিক বিভাজনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি ক্লিয়ার হওয়ার জন্য আমিও ইউএনও এবং পিআইও এর সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন ভেকু দিয়ে নাকি কাজ করা যাবে।
প্রতিনিধি/এআরএম