images

সারাদেশ

কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল, তালাবন্দি ১১ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার রুম

উপজেলা প্রতিনিধি

১৭ জুন ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ১৩টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাবের মধ্যে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাবের কক্ষগুলো দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। কোথাও তালায় জং ধরেছে, কোথাও পোকামাকড়ের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে ল্যাব রুম। ফলে প্রায় ২২৫টি কম্পিউটার অলস পড়ে রয়েছে, এর মধ্যে কিছু সচল থাকলেও অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়েছে।

দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইসিটি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’সহ একাধিক নামে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করেছিল সরকার। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত দুই ধাপে সারাদেশের ন্যায় হাতিয়া উপজেলার ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এসব ল্যাব স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে সরবরাহ করা হয় স্মার্ট টিভি ও স্মার্ট বোর্ড।

তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দাবি, অপারেটর নিয়োগ না থাকায় ল্যাবগুলো স্থাপনের পর অল্প কিছুদিন ব্যবহার হলেও পরে সেগুলো তালাবদ্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক স্থানে সেগুলো কার্যত সিলগালার অবস্থায় পড়ে থাকে।

f2456ce9-277a-40a4-8685-c4d29c45331b

মঙ্গলবার (১৬ জুন) সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।

হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের ডিজিটাল ল্যাব কক্ষের সামনে গিয়ে দেখা যায়, তালায় মরিচা ধরেছে। কলেজের কর্মচারীরা জানান, দীর্ঘদিন এটি সিলগালা অবস্থায় ছিল। বিষয়টি স্বীকার করে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এইচ. এস. সাইফুল আলম ও সাবেক অধ্যক্ষ তোফায়েল হোসেন বলেন, কলেজে ১৭টি কম্পিউটার ও একটি স্মার্ট টিভি দেওয়া হলেও অপারেটর না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এক-দুইটি সচল থাকলেও অধিকাংশই অকেজো।

কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নজরুল ও ফয়সাল জানান, তারা কখনো ল্যাবরুম খোলা দেখেননি, সেখানে কোনো ক্লাসও হয়নি।

হাতিয়া শহর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সোহেল উদ্দিন বলেন, তাদের বিদ্যালয়ে পাঁচটি কম্পিউটার সচল রয়েছে। মাঝে মধ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। তবে অপারেটর পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হচ্ছে।

b5ddfece-dfc6-42be-bdd2-d44145b486dd

অন্যদিকে সুখচর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় ও আব্দুল মোতালেব উচ্চ বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ল্যাব কার্যক্রম চালু রয়েছে। সরেজমিনে সেখানে প্রশিক্ষণ ও ক্লাস চলতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠান দুটির প্রধানরা জানান, ল্যাবের ৫ থেকে ৬টি কম্পিউটার সচল থাকলেও বাকিগুলো অকেজো হয়ে গেছে।

আব্দুল মোতালেব উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কুশি, বিথি ও তাদের সহপাঠীরা জানান, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক ও অপারেটর দুজনই থাকায় তারা নিয়মিত ক্লাস ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন।

1fa3c39b-4355-4fd1-a2a0-9078e836e202

অপরদিকে হাতিয়া ডিগ্রি কলেজ, প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম মহিলা কলেজ, হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজ, কেএসএস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রহমানিয়া ফাজিল মাদরাসা, এমসিএস উচ্চ বিদ্যালয়, ছৈয়দিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, চৌমুহনী উচ্চ বিদ্যালয়, এসটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং আয়েশা ফেরদৌস উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব কার্যক্রম অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কতগুলো কম্পিউটার সচল কিংবা অকেজো রয়েছে, সে তথ্যও কর্তৃপক্ষের জানা নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে ১৭টি করে কম্পিউটার ও একটি করে স্মার্ট টিভি দেওয়া হয়েছিল। শুধু সুখচর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ‘স্কুল অব ফিউচার’ প্রকল্পের আওতায় চারটি ডেস্কটপ কম্পিউটার ও ছয়টি স্মার্ট বোর্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন বাজারমূল্যে এসব সরঞ্জাম ও ফার্নিচার মিলে প্রতিটি ল্যাব-এ সরকারের কমসেকম ১৫ লাখ টাকা করে প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ পড়েছে।  

c178f414-8e41-4dc4-86aa-62fa7475571e

তবে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ ব্যয়ে, কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ল্যাবগুলো স্থাপন করা হয়েছে তার তথ্য দিতে পারেননি উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা(অতিরিক্ত) মো. মিজানুর রহমান।

তিনি জানান, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের এ প্রকল্প তখন আইসিটি আগারগাঁও হেড অফিস থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সব তথ্য হেড অফিসে রয়েছে।

ডিজিটাল ল্যাবগুলোর এমন দুরবস্থার কারণে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়াসহ সরকারের কোটি টাকার সম্পদ অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

d574cdb6-d1a0-46ad-bbec-7efb789c85c4

এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আবুল কাশেম বলেন, “আমি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি, অফিসের দায়িত্বরতদের থেকে জেনেছি- প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অফিসকে তেমন কিছু জানানো হয়নি। ফলে এগুলোর মনিটরিং সংক্রান্তে ভূমিকা রাখা যাচ্ছে না।"

এদিকে, দ্বীপাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করেন নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ।

গত ৯ জুন জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানতে চান, উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল হাতিয়ার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আধুনিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী?

f2456ce9-277a-40a4-8685-c4d29c45331b

জবাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতাধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতর বাস্তবায়নাধীন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’ এর আওতায় নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় এ পর্যন্ত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, প্রকল্পের পরিধি বাড়িয়ে সারাদেশে আরও এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস