জেলা প্রতিনিধি
১৪ জুন ২০২৬, ১০:২৫ এএম
অক্সিজেন না দেওয়ায় রোগী মারা গেছেন। এমন অভিযাগে চিকিৎসককে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে দিনভর চলে উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ। পরে ইন্টার্ন চিকিৎসকের দাবির প্রেক্ষিতে মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেন কান ধরে ওঠবস করতে হয়। শাস্তি ভোগ শেষে মারা যাওয়ার ১০ ঘণ্টা পর লাশ ফেরত পান পরিবার। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নেটিজেনদের বেশিরভাগ কটু মন্তব্য চিকিৎসকদের নিয়ে।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূর নাহার বেগমকে শনিবার ভোর ৪টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির ১৫ মিনিট পর তার মৃত্যু হয়। এসময় অক্সিজেনের অভাবে রোগী মারা গেছে— এমন অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তার ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে অক্সিজেনের বিষয়কে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এ সময় মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিব হাসান ও ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা লাশ মর্গে নিয়ে জিম্মি করে বিচারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। একপর্যায়ে তারা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। যার কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকে। এ সময় মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে এনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।
এদিকে, মরদেহ হস্তান্তরের দাবিতে রোগীর স্বজনরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
এ সময় মৃতের ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, আমার মা ভোরে মারা গেছেন, প্রায় ১০ ঘণ্টা হচ্ছে এখন পর্যন্ত মায়ের মুখটা দেখতে পারিনি। মায়ের লাশ অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে তারা মর্গে জিম্মি করে রেখেছে। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার ক্ষমা চেয়ে লাশ চেয়েও পাচ্ছি না।
স্বজনরা দাবি করে বলেন, ঘটনার পর নিজেদের অবহেলার অভিযোগ এড়াতে হাসপাতালের চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা মরদেহ আটকে রাখে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা অজুহাত আর দাবি তুলে মরদেহ হস্তান্তরে বিলম্ব করে। এক পর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেন পরিচালকের কক্ষে উপস্থিত হয়ে সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করেন। এরপরে মেলে মায়ের লাশ।
মায়ের লাশ পেতে ছেলের কান ধরে উঠবস করানোর ভিডিও ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ হাসপাতালের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে। তবে বেশিরভাগ নেটিজেনরা মায়ের লাশ আটকে রেখে ছেলেকে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় চিকিৎসকদের অমানবিক উল্লেখ করে সমালোচনা করেন।
এদিকে, মৃতের ছেলেকে কানধরে উঠবস করার বিষয়ে কোন ইন্টার্ন চিকিৎসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে মৃতের স্বজন কর্তৃক চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনা দেখা গেছে। চিকিৎসকের মারধরের ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা কারোই কাম্য নয়। এ ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহটি মরচুয়ারিতে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে মৃতের ছেলেকে কান ধরে উঠবস করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে তিনি এড়িয়ে যান।
প্রতিনিধি/টিবি