উপজেলা প্রতিনিধি
১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকা হাতিয়ার সাগুরিয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বন উজাড় ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। টাকা পেলেই বনভূমি দখল, গাছ কেটে ভিটা-বাড়ি নির্মাণ, দোকানঘর স্থাপন ও চাষাবাদের সুযোগ করে দেন তিনি। একই সঙ্গে মধু আহরণ ও খাল ইজারা নিয়েও নানা কারসাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনভূমির একাধিক স্থানে গাছ কেটে জমি পরিষ্কার করা হয়েছে। কোথাও নতুন ভিটি নির্মাণ, কোথাও বসতি স্থাপন, আবার কোথাও চাষাবাদ চলতে দেখা গেছে।

বুড়িরচর ইউনিয়নের আলাদিগ্রাম বাজারের দক্ষিণ পাশে চরআলিম বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় একশ একর বনভূমি ধাপে ধাপে পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত সপ্তাহে তিন দিনের ব্যবধানে নিজাম চৌধুরীর মাধ্যমে এস্কেভেটর মেশিন ব্যবহার করে ৯টি ভিটি নির্মাণ করা হয় এবং সেখানে দ্রুত ঘর তোলা হয়।
যোবায়ের, আশরাফ ও মাইন উদ্দিনসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, স্থানীয় ফরেস্ট ক্যাম্পের মোহসীন ও জুয়েল কালাম মাঝির বাড়ির পাশে নির্মিত এসব ভিটি প্রতি ২০ হাজার টাকা করে সংগ্রহ করেছেন। যা সরাসরি চলে যায় রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে। তবে মোহসীন জানান, ভিটি নির্মাণের ছবি রেঞ্জ কর্মকর্তার মেসেজে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলেছে।

স্থানীয়দের তথ্য মতে, আলাদিগ্রাম বাজারের পশ্চিম পাশে এনাম নামের এক প্রভাবশালী প্রায় ২০ একর বনভূমি দখল করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। তিনি বন ও ভূমি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চাষাবাদকৃত এসব বনভূমির পশ্চিম (বেড়ি সংলগ্ন) ও উত্তর পাশে প্রায় চার একর জায়গা ১০টি ভূমিহীন পরিবারের কাছে বিক্রি করেন।
এ কার্যক্রমে বন বিভাগের বোট চালক আবুল হাসেম ও পরবর্তীতে ক্যাম্প স্টাফ মোহসীনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, টানবাজার দক্ষিণ পাশে চরআলিম (লালচর রাস্তা) সংলগ্ন বন কেটে আড়াই একর জায়গায় এস্কেভেটর দিয়ে রাতারাতি বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে ভুট্টো নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণ শুরুর তিন ঘণ্টা আগে বোটচালক আবুল হাসেম এক লাখ টাকার চুক্তি সম্পন্ন করেন। এরপর থেকে বন বিভাগের কেউ আর ঘটনাস্থলে যায়নি।
এর উত্তর-পূর্ব কোণে আলাউদ্দিন মাঝি বনের প্রায় ৫০টি গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করার চিত্রও দেখা গেছে।
লালচর এলাকায় পূর্বে উচ্ছেদ হওয়া তিনটি দোকানঘর পুনর্নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধ। এ বিষয়ে স্থানীয় খোকন বলেন, এই জায়গার ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, হাজতও খেটেছি। অথচ সুবিধা ভোগ করে এখন অন্যরা।

একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, চরআলিম বিটের দায়িত্ব সরাসরি রেঞ্জ কর্মকর্তার অধীনে থাকায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া, বনের মধু আহরণ ও বিভিন্ন খাল ইজারা নিয়েও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কাদিরার খাল, আলিজ্জার খাল, পচার খাল, পরিক্ষিত খাল ও বুড়িরদোনা খালের নাম উল্লেখ করেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ অস্বীকার করে সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। বন রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে স্টাফদের দায়িত্ব দেওয়া আছে।
এ বিষয় নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের কর্মকর্তা ও সহকারী বন রক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে হেল্প প্রকল্পের আওতায় চরআলিমে ১০০ হেক্টর এবং ভাসানচরে ৩২০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের দায়িত্ব পায় সাগুরিয়া রেঞ্জ। তবে সরেজমিনে সেই বনের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
এভাবে দখল-দুর্নীতি ও অনিয়ম চলতে থাকলে উপকূলীয় পরিবেশ, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং সরকারি সংরক্ষিত সম্পদ মারাত্মক ঝুঁকির দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রতিনিধি/এসএস