১০ জুন ২০২৬, ১০:৩১ পিএম
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান ও তার ছেলে-ভাতিজাসহ ১২ জনের বিচারকাজ শুরু হয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। এরপর আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হয়। এদিন, আদালতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়ায় গুলিতে নিহত আবুল হাসান স্বজনের বড়ভাই মো. আবুল বাশার অনিক জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে অনিক জানান, ওই দিন শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগী বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়নের পিস্তল থেকে ছোড়া গুলিতে মৃত্যু হয় তার ভাই স্বজনের।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন— শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, সাংবাদিক রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ও কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, মহানগর যুবলীগের সাবেক সভাপতি যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সোহানুর রহমান শুভ্র।
গত ১৩ মে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ১২ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।
তিনটি অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাক কর্মী রাসেল, ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ ছয়জনকে হত্যার কথা বলা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিব এবং তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসান স্বজনকে হত্যার কথা উল্লেখ করে প্রসিকিউশন।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দাখিল করা ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। তবে আসামিরা সবাই পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ শুরু হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে পরোয়ানাও জারি করা হয়।
শামীম ওসমানের ছেলের গুলিতে আবুল হাসান মারা যায়:
আবুল বাশার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কুশিয়ারা গ্রামের বাসা থেকে তিনি ও আবুল হাসান বের হন। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁরা নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া মোড়ের উদ্দেশে রওনা দেন। চাষাড়া মোড়ে আন্দোলনে যোগ দিলে বিজিবি, পুলিশ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাঁদের ধাওয়া করে। পরবর্তী সময়ে তারা চাষাড়া মোড়ে অবস্থান নেন। চাষাড়া মোড় থেকে মিশনপাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে যান তারা।
‘আবার মিছিল নিয়ে চাষাড়া মোড়ের দিকে আসতে থাকেন, তখন ল্যাবএইড হাসপাতাল গলিতে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমীরী ওসমান, শ্যালক তানভীর রহমান টিটু, শাহ নিজাম, আবদুল করিম বাবু (ডিস বাবু), কামরুল হাসান মুন্না, ছাত্রলীগ নেতা শুভ, রিয়াদ, সোহানুর রহমান শুভ্র, মেহেদী, ফরহাদসহ ১০০–২০০ জন অস্ত্রধারী তাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করেন। অয়ন ওসমানের পিস্তল থেকে ছোড়া গুলি তার ভাই আবুল হাসানের বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হয়’, জবানবন্দিতে বলেন নিহতের ভাই।
আবুল বাশার বলেন, গুলিবিদ্ধ আবুল হাসানকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য শামীম ওসমানের নির্দেশ ছিল। তাই ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে তার ভাইকে ভর্তি করানো হয়নি, চিকিৎসাও দেয়নি। তারা সঙ্গে সঙ্গে একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁর ভাইকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা।
বাশার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় তার ভাইকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার শেষে তাকে পর্যবেক্ষণ কক্ষে (অবজারভেশন রুম) নেওয়া হয়। ঘণ্টাখানেক পর তার ভাইয়ের জ্ঞান ফেরে। তিনি পর্যবেক্ষণ কক্ষে দেখা করতে যান। তার ভাই তাকে দেখে প্রথমে জানতে চান, হাসিনার পতন হয়েছে কি না। হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভাই মুচকি হাসি দেন। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে তিনি চুপ হয়ে যান। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিকেল ৫টায় তার ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিনিধি/ক.ম/