images

সারাদেশ

আশুগঞ্জে ২ দফা অভিযানের পরও ফের সক্রিয় বালু ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেট

জেলা প্রতিনিধি

০৭ জুন ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দুই ও তিন ফসলি কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী ও ড্রেজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের দাবি, কৃষিজমি, খাল, জলাশয় ও সরকারি খাস জমি ভরাট করে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে এলাকার কৃষি ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।

সম্প্রতি উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের পাগলা নদী তীরবর্তী এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ভরাটের অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন দুই দফা অভিযান চালায়। অভিযানে ড্রেজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া না গেলেও যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ পাইপ অপসারণ করা হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও তা স্থায়ী হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, কয়েকদিনের ব্যবধানে একই এলাকায় নতুন করে আরেকটি ড্রেজার বসানো হয়। এবার পাগলা নদী থেকে শরীফপুরের খোলাপাড়া হয়ে আড়াইসিধা ইউনিয়নের দগরিসার গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করে বালু ও মাটি ভরাটের কাজ শুরু করা হয়েছে। মাঝপথে বসানো হয়েছে দুটি শক্তিশালী ডাম্পিং মেশিন, যার বিকট শব্দে দিন-রাত অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদী থেকে দগরিসার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় একের পর এক কৃষিজমি ঘিরে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তুত করা হচ্ছে নতুন ভরাট প্রকল্প। এসব এলাকার মধ্যে সরকারি খাল ও খাস জমিও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীর ছত্রচ্ছায়ায় এই কার্যক্রম চলছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। এমনকি আগের ড্রেজারের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের পর একই স্থানে নতুন করে ড্রেজার স্থাপনের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, অভিযান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কাজ বন্ধ হয়নি। বরং নতুন উদ্যোমে চলছে। তাহলে সেই অভিযান কাদের স্বার্থে ছিল?

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিষেধ করার পরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে।

এদিকে, বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় দুটি সিন্ডিকেটের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে কোনো সময় সংঘর্ষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

কৃষি বিভাগের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, দুই ও তিন ফসলি জমি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব জমি ভরাট হতে থাকলে শুধু কৃষি উৎপাদনই কমবে না, বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতাও বাড়বে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, আশুগঞ্জে বছরের পর বছর ধরে সড়কের পাশের খাল, বিল, ডোবা, পুকুর ও কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতবাড়ি, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলাধার। একসময় যেখানে ধান ও সবজির ক্ষেত ছিল, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে কংক্রিটের দালান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন ও ভূমি ব্যবহারের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনজীবনে।

সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার কৃষিজমি সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত মনিটরিং ছাড়া এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

প্রতিনিধি/টিবি