নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকন্যাকে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এত দ্রুত কোনো মামলার তদন্ত শেষ করার রেকর্ড চট্টগ্রামে আর নেই।
শুক্রবার (৫ জুন) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী। তিনি বলেন, চার বছরের সেই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মনির হোসেনকে একমাত্র অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এটি এখন ডকেট শাখা থেকে ষষ্ঠ আমলি আদালতে পাঠানো হবে। জনদাবির মুখে স্পর্শকাতর ঘটনাটির তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ মামলার আসামি মনিরকে আটকের ঘটনায় ২১ মে গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে বাকলিয়া রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। নিজেরাই বিচার করার দাবি তুলে জনতা আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘাত শুরু হয়। মামলার একমাত্র আসামি ২২ মে আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
মনির এখন কারাগারে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। সঙ্গে ছিলেন থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান।
একজনকে আসামি ও ১৩ জনকে সাক্ষী করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানালেন ওসি সোলাইমান। তিনি বলেন, আসামির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি, ভিকটিমের ২২ ধারার জবানবন্দি, মেডিকেল ও ডিএনএ প্রতিবেদন এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ধর্ষণের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনার সঙ্গে আসামি মনির ছাড়া আর কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
ওসি বলেন, সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় গত ২২ মে বাকলিয়া থানায় মামলা করা হয়েছিল। ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকারি বন্ধ ছিল। আজ বৃহস্পতিবার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, মনির শিশুটিকে ফুসলিয়ে ডেকোরেশনের গুদামের ভেতর নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে। এতে শিশুটির রক্তক্ষরণ হয়। সর্বশেষ সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯(১) ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে গণ্য করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আগামী রোববার অভিযোগপত্র নির্ধারিত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে প্রসিকিউশন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত আসামি মনির হোসেনের (৩০) বাড়ি কুমিল্লায়। চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার নুর হোসেন চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় ভাই ভাই ডেকোরেশনের কর্মচারী ছিলেন তিনি। বসবাস ওই এলাকাতেই।
সূত্রমতে, শিশু ধর্ষণের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২১ মে বিকেল ৫টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যান ঘাটা আবু জাফর রোড এলাকা। শত শত লোক অভিযুক্ত যুবককে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সড়কে অবস্থান নেয়, পুলিশের গাড়ি আটকে দেয় এবং পরে একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন দেয়।
টানা ৬ ঘণ্টা একটি ভবনে অবরুদ্ধ রাখার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়। অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে স্থানীয়রা। তারা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল থানা ঘেরাও করতে মূল সড়কে পৌঁছে যায়। এ সময় কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে। পরে অভিযুক্ত মনির হোসেনের বিরুদ্ধে পরদিন শুক্রবার শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলাটি করেন। ওই দিন বিকেলে আদালতে হাজির করা হলে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ভুক্তভোগী শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিল ছয় দিন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি ফিরে গেছে শিশুটি।
প্রতিনিধি/এফএ