জেলা প্রতিনিধি
০২ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম
দীর্ঘ ১০ বছর পর বাড়ি ফিরছিলেন পরিবারের সবচেয়ে আদরের সন্তান। তাকে ঘিরে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, অপেক্ষা আর আনন্দের আয়োজন। বাড়ির উঠোনে নতুন পুত্রবধূকে বরণ করার প্রস্তুতি চলছিল, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা শেষ হলো এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা উজ্জ্বলপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের বাড়িতে এখন শুধুই কান্না। যে উঠোনে ছেলেকে বরণ করে নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে সারিবদ্ধ চারটি খাটিয়ায় শায়িত প্রিয়জনদের নিথর দেহ। পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে এই শোকে।
পরিবারের বড় ছেলে আরিফ ইসলাম প্রায় এক দশক আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। অভাব-অনটনের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনাই ছিল তার লক্ষ্য। বিদেশের মাটিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিবারের ঋণ শোধ করেছেন, সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিন মাসের ছুটিতে দেশে ফিরছিলেন তিনি। এবার আর বিদেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। দেশে থেকেই বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন।
সোমবার (১ জুন) রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে বরণ করে নিতে গিয়েছিলেন মা নুর জাহান, ছোট ভাই রাকিব, বোন আয়েশা খাতুন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা। বিমানবন্দর থেকে ভাড়া করা একটি প্রাইভেটকারে সবাই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হয়নি।
মঙ্গলবার (২ জুন) ভোরে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম এলাকায় তাদের বহনকারী প্রাইভেটকারটি একটি দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আরিফ ইসলাম, তার মা নুর জাহান, বোন আয়েশা খাতুন এবং গাড়িচালক জাহিদ হোসেন। গুরুতর আহত ছোট ভাই রাকিবকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।
একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।
বৃদ্ধ ইজিবাইক চালক শহিদুল ইসলাম এখন যেন নিঃস্ব এক মানুষ। জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি হারিয়েছেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও একমাত্র মেয়েকে। যে বাবা রাতভর ছেলের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, ভোর হতেই তাকে শুনতে হয়েছে মৃত্যুর খবর। যে সন্তানদের হাসিমুখ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর সেই সন্তানদের লাশ গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে।
পরিবারটির অর্থনৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়েছে। প্রবাসী আরিফ ছিলেন সংসারের প্রধান উপার্জনকারী। ছোট ছেলে রাকিব ছিল ভবিষ্যতের ভরসা। একসঙ্গে দুই কর্মক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শহিদুল ইসলামের পরিবার এখন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে আয়েশা খাতুনের দুই শিশু সন্তান। আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আশরাফুল ও তাসফিয়া এখনও বুঝতে পারেনি, তারা চিরদিনের জন্য হারিয়েছে তাদের মাকে। স্ত্রীকে হারিয়ে তাদের বাবা ইলিয়াছও এখন গভীর শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
মামলার বাদী ইলিয়াছ বলেন, অভাব ঘোচাতে আরিফ মালয়েশিয়ায় ছিল। এবার দেশে ফিরে বিয়ে করবে বলে সব আয়োজন চলছিল। তাকে আনতে আমার স্ত্রী, শাশুড়ি, দুই শ্যালক ও আমার দুই সন্তান বিমানবন্দরে গিয়েছিল। গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় আমি যেতে পারিনি। এখন মনে হয়, না যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বেঁচে থাকা। আমার শ্বশুর ছাড়া সেই পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই।
গ্রামবাসীরা বলছেন, এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা তারা আগে দেখেননি। যে বাড়িতে বিয়ের আলোচনা চলছিল, সেখানে এখন শোকের মাতম। যে ঘরে নতুন স্বপ্নের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা, স্বপ্ন ও আশ্রয়। বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের এই ট্র্যাজেডি আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার বেদনার গল্প হয়ে উঠেছে।
প্রতিনিধি/এসএস