জেলা প্রতিনিধি
০১ জুন ২০২৬, ১১:১১ এএম
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও আশপাশের বালিয়াড়ি দখল করে আবারও অবৈধ দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে রাতের আঁধারে বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত অস্থায়ী স্থাপনা।
গত চার থেকে পাঁচ দিনে অন্তত চার শতাধিক দোকান-রেস্তোরাঁ বসানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় আরও দোকান নির্মাণের প্রস্তুতি চলার অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথবাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি থেকে ৯৩০টি অবৈধ দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে।
পরে সৈকত পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, উচ্ছেদকৃত বালিয়াড়িতে যেন আর কোনো দোকান বা স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে এবং দখলমুক্ত অবস্থা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে সতর্ক থাকতে হবে। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ঈদুল আজহার ছুটিতে পুনরায় বালিয়াড়ি দখল করে শত শত দোকান বসানো হয়েছে।
শনিবার রাতেও কলাতলী সৈকত ও সিগাল হোটেলসংলগ্ন ঝাউবাগান এলাকায় নতুন করে দোকানপাট স্থাপনের দৃশ্য দেখা গেছে। এসব দোকানে শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য, কাপড়, রোদচশমা, আচার, প্রসাধনসামগ্রী, ভাজা মাছ, চা-কফি ও বিভিন্ন খাবার বিক্রি হচ্ছে।
অধিকাংশ দোকান ভ্যানগাড়ির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থে ভ্যানের নিচে চাকা লাগানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন দোকানি।
সরকার ১৯৯৯ সালে নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। বিধি অনুযায়ী, জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ( ধরা) কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি চক্র বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর সুযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সৈকতের প্রবেশমুখে গড়ে ওঠা এসব ঝুপড়ি দোকান পর্যটকদের দুর্ভোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশেরও ক্ষতি করছে। গত মার্চে উচ্ছেদ অভিযানের পর সৈকতে স্বস্তিকর পরিবেশ ফিরেছিল। কিন্তু ঈদের ছুটিতে আবারও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ শুরু হওয়ায় হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, গত ১২ মার্চ যেসব স্থান থেকে দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেসব জায়গাতেই পুনরায় দোকান বসানো হয়েছে। সুগন্ধা জামে মসজিদসংলগ্ন বালিয়াড়িতে শতাধিক দোকান স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ দোকানে কোনো সাইনবোর্ড বা মালিকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
একটি দোকানের কর্মচারী মুজিবুর রহমান বলেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দোকানমালিকেরা উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। এরপর তারা নতুন করে দোকান বসানো শুরু করেন। তার দাবি, উচ্ছেদের আগে প্রায় ১০ বছর ধরে তাদের দোকান সেখানে ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত এক বিচকর্মী জানান, ঈদের আগের রাত থেকেই ঝুপড়ি দোকান বসানোর কাজ শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে চার শতাধিক দোকান স্থাপন করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে ভ্রমণে আসেন। তাদের অধিকাংশই সৈকতে যান।
বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা ঝুপড়ি দোকান পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে এবং সেখানে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। মার্চ মাসে উচ্ছেদ অভিযানের পর সৈকতের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছিল। কিন্তু পুনরায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে সেই পরিস্থিতি আবারও ফিরে এসেছে। এতে বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের সময় পর্যটকদের সৈকতে যেতে অনীহা দেখা দিচ্ছে।
সচেতন মহলের দাবি, কক্সবাজারের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন শিল্প রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান দখলমুক্ত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংস্করণটি সংবাদপত্রে প্রকাশযোগ্য ফরম্যাটে সম্পাদনা ও পুনর্লিখন করা হয়েছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আবারও ইসিএভুক্ত বালিয়াড়ি দখল করা হচ্ছে।
এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সুগন্ধা, কলাতলী ও সিগাল পয়েন্ট ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এমনকি কলাতলী সৈকতের সাগরলতা সংরক্ষিত এলাকাতেও রেস্তোরাঁ ও বাজার গড়ে তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে ৯ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আদালত থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রিটের জবাব দেওয়ার পর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এআরএম