images

সারাদেশ

ঈদ ছুটিতেও কর্মব্যস্ততায় কাটছে যাদের দিন

জেলা প্রতিনিধি

২৯ মে ২০২৬, ১১:০৯ পিএম

ঈদ বাঙালি জীবনের একটি আনন্দঘন ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ঈদ আসার আগে সবারই প্রধান চিন্তা থাকে আত্মীয়-স্বজনের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার। বিশেষ করে ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষের অনুভূতিটাই থাকে অন্য রকম। চারিদিকে উল্লাস, নতুন পোশাকের সুবাস আর বাতাসে ভেসে আসা সেমাই-পোলাওয়ের মিষ্টি ঘ্রাণ। ঈদের সকাল মানেই পরিবার-পরিজনের সাথে কোলাকুলি, আড্ডা আর এক টুকরো পরম শান্তি।

কিন্তু এই চেনা উৎসবের সমান্তরালে রয়েছে অন্য এক জগৎ, যেখানে ঈদের চাঁদ আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও যান্ত্রিক জীবনে কোনো বিরতি আনে না। যখন পুরো দেশ উৎসবের আমেজে মগ্ন, তখনো কিছু মানুষ নিজের আনন্দকে বিসর্জন দিয়ে সচল রাখছেন সমাজের চাকা। মানবসেবায় তারা বিলিয়ে দেন তাদের ঈদের আনন্দ। শুধু তারাই নন, বিশাল এক ত্যাগ স্বীকার করেন তাদের স্ত্রী, সন্তান বা স্বজনেরা। জরুরি সেবা, নিরাপত্তা কিংবা গণমাধ্যমের মতো সংবেদনশীল পেশায় নিয়োজিত এই মানুষগুলোর কাছে ঈদের দিনটি অন্য যেকোনো সাধারণ কর্মদিবসের মতোই কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও কিছুটা বেশি ব্যস্ততার।

ঈদের দিন সকালে যখন সবাই নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছেন, দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগের সামনে তখন সাইরেন বাজিয়ে এসে থামছে অ্যাম্বুলেন্স। মুহূর্তের মধ্যে স্ট্রেচার হাতে ছুটে যাচ্ছেন কর্তব্যরত আয়া, নার্স ও ওয়ার্ড বয়রা। চিকিৎসা দিতে দৌড়ে আসেন চিকিৎসকরা। সাদা অ্যাপ্রোনে ঢাকা পড়া এই মানুষগুলোর কাছে ঈদের আনন্দ মানে কোনো মুমূর্ষু রোগীর মুখে ফুটে ওঠা স্বস্তির হাসি।

ঈদে সবাই যখন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আনন্দে মশগুল থাকেন, তখন দায়িত্বের কারণে পরিবার-পরিজন ছেড়ে হাসপাতালে কাজ করতে খারাপ লাগে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সদ্য সাবেক আবাসিক চিকিৎসক হোসেন ইমাম বলেন, ‘এটি যে শুধু আমাদের চাকরি, সেটা ভাবলে চলে না। মানুষের ভোগান্তি ও কষ্ট লাঘবের জায়গায় আমরা কাজ করি। কোনো কোনো ঈদে আমাদের ডিউটি থাকে। তখন পরিবার ও সন্তানদের মন খারাপ হয়। প্রথম প্রথম আমাদেরও হতো, কিন্তু এখন মানিয়ে নিয়েছি। যখন দেখি আমাদের একটুখানি প্রচেষ্টায় একটি পরিবার ঈদের দিনে বড় কোনো বিপর্যয় থেকে বেঁচে গেল, তখন সেই তৃপ্তির কাছে নিজের উৎসবহীনতা খুব ছোট মনে হয়।’

তীব্র রোদ কিংবা ঝুম বৃষ্টি, ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারা থামে না কখনোই। ঈদের দিনে ফাঁকা রাস্তায় যখন দু-একটি গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটে চলে, তখনো মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, র‍্যাব ও বিভিন্ন নিরাপত্তা কর্মীরা উৎসবের দিনগুলোতে থাকেন বাড়তি সতর্কতায়।

যখন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শহরের কোলাহল ছেড়ে নাড়ির টানে গ্রামের অভিমুখে রওনা হন হাজার হাজার চাকুরিজীবী বা জীবিকার কারণে শহরে থাকা মানুষ, তখন তাদের জানমালের নিরাপত্তায় অতন্দ্র প্রহরী হয়ে কাজ করেন এসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঈদের সকালে যখন নতুন কাপড় পরে বাবার হাত ধরে কোনো সন্তান নামাজ শেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন অন্য কোনো সন্তানের বাবার হাতে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব।

এসব বিষয়ে কথা হয় কুষ্টিয়া জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক কাজী হাসানুজ্জামানের সাথে। ঈদের ছুটি না পেলে মন খারাপ লাগে কিনা এমন প্রশ্নে মৃদু হেসে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন অনেক ঈদ গেছে যখন বাড়ি থেকে সন্তানের ফোন আসায় চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়েছে। তবে এখন আর তেমন কষ্ট হয় না। কারণ আমরা ধরেই নিই যে আমরা ছুটি পাব না। তার মধ্যে যদি আবার হঠাৎ জানতে পারি যে ছুটি পেয়েছি, সেই আনন্দ আবার অন্য রকম। যতই যান্ত্রিক জীবনে বসবাস করি না কেন, আমরাও তো মানুষ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অনেকেরই এমন অনেক ঈদ গেছে, ঈদের নামাজটাও জামাতে পড়তে পারিনি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডিউটি করেছি। সন্তানরা বাড়ি থেকে ফোন করে কান্নাকাটি করে। তবে সান্ত্বনা একটাই আমরা জেগে আছি বলেই দেশের মানুষ নিরাপদে, নির্বিঘ্নে উৎসব করতে পারছে।’

টেলিভিশনের পর্দায় যখন ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা বা বিনোদনমূলক আয়োজন চলে, কিংবা পত্রিকার পাতায় যখন ঈদের রঙিন খবরাখবর ছাপা হয়, অথবা ঈদের দিনের কোনো বড় ঘটনার খবর মানুষ ঘরে বসে দেখেন তার পেছনে কাজ করেন একদল সংবাদকর্মী। সাংবাদিক, ভিডিওগ্রাফার, সংবাদ উপস্থাপক এবং কারিগরি দলের সদস্যরা দিন-রাত এক করে কাজ করে যান। দেশ-বিদেশের ঈদের খবরাখবর তাৎক্ষণিক মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিতে গিয়ে তারা ভুলে যান নিজেদের উৎসবের কথা।

তেমনি কুষ্টিয়ার একজন নারী সংবাদকর্মী সাবিনা ইয়াসমিন শ্যামলী। অসময়ে স্বামীকে হারিয়ে ধরেছেন সংসারের হাল। তিনি একাধারে একজন মা, অন্যদিকে দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নিজস্ব প্রতিবেদক। তিনি জানান, ‘এটি শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালনের সময় কোনো পিছুটান আমরা বাধা মনে করি না হোক সে আনন্দ বা কষ্টের। তাইতো সবাই যখন পরিবার নিয়ে ঈদ কাটাতে ব্যস্ত, আমাদের তখন ছুটে বেড়াতে হয় সংবাদের পেছনে। মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াটাই আমাদের ঈদ।’

শুধু চিকিৎসক, পুলিশ বা সাংবাদিক নন, আমাদের চারপাশের নাগরিক জীবন সচল রাখতে ঈদের দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন আরও অনেকেই। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা যেকোনো অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার ক্ষতি এড়াতে ঈদের দিনও ফায়ার স্টেশনের লাল গাড়িগুলো নিয়ে প্রস্তুত থাকেন। পরিবার ছেড়ে স্টেশনেই কাটে তাদের ঈদ। উৎসবের দিনে যেন গৃহস্থালি কাজে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ কর্মীরা কন্ট্রোল রুম ও টেকনিক্যাল টিমে দিনভর কাজ করেন। 

একটি লাইনে ত্রুটি দেখা দিলেই ছুটে যান তারা। পাশাপাশি ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য আমরা যে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট পাচ্ছি, তার পেছনে ডাটা সেন্টারে বসে দায়িত্ব পালন করছেন শত শত টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট প্রকৌশলী।

দিন শেষে উৎসবের আলো যখন নিভে আসে, সবাই যখন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে, তখনও এই মানুষগুলো জেগে থাকেন। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু বুক ভরা থাকে দায়িত্ববোধ। নিজের পরিজনকে দূরে রেখে অন্যের পরিবারকে সুরক্ষিত ও স্বস্তিতে রাখার এই যে আত্মত্যাগ, তা কোনো উৎসবের বোনাস বা ওভারটাইমের টাকায় মাপা সম্ভব নয়। 

এই উৎসবহীন মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ দায়িত্বশীলতার ওপর ভর করেই টিকে থাকে আমাদের উৎসবের রঙিন দিনগুলো। স্যালুট এই সম্মুখসারির নায়কদের, যাদের ত্যাগে সচল থাকে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ ও দেশের সকল উৎসব।

প্রতিনিধি/একেবি