নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ মে ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
চামড়া কেনা তো দূরের কথা, ঈদুল আজহার দিন সকাল গড়িয়ে বিকেল হলেও কোনো ক্রেতা একটিবার দেখতেও আসেনি কোরবানির পশুর চামড়া। গত ১৩ বছর ধরে এমন চিত্র চট্টগ্রামের। ২০১০ সালের আগেও প্রতিবছর কোরবানিতে পশু জবাইয়ের পর চামড়া কেনার জন্য কয়েকটা পার্টি দেখতে এসে দরদাম করত। কিন্তু এবার কেউ এলো না।
কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা খোকন চৌধুরী। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, কোরবাানির পশুর চামড়া এত মূল্যহীন যে, মাদ্রাসায় সম্পূর্ণ ফৃতে দিয়ে দিতে হচ্ছে। অথচ দেশে চামড়াজাত পণ্যের দাম আকাশচুম্বী।
এমদাদ হোসেন একজন বলেন, বিগত বছরগুলোতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার সিন্ডিকিটের মাধ্যমে কোরবাানির পশুর চামড়াকে মূল্যহীন করে গরিবের হক হাইজ্যাক করেছিল। কিন্তু এবার ভাবছিলাম সরকার পরিবর্তন হওয়াতে কোরবানির পশুর চামড়ার ভালো দাম পাওয়া যাবে, সিন্ডিকেট ভাঙবে। কিন্তু যে লাউ, সেই কদু। বরং বিগত ১৩-১৪ বছরের মতো চামড়ার মূল্য এবারও মূল্যহীন। সম্পূর্ণ ফ্রিতে দিয়ে দিতে হয়েছে বিভিন্ন এলাকার মাদরাসাগুলোতে।
নগরীর শুলকবহর মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আনসারুল ইসলাম বলেন, মাদরাসার পক্ষ থেকে আগে কোরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হলেও তা সংরক্ষণ করে বিক্রির পর লাভের টাকা দিয়ে এতিম ছাত্রদের জন্য খরচ করা হতো। কিন্তু এবার চামড়ার যে দাম, চামড়া সংগ্রহ করে আনতে যে পরিমাণ গাড়ি ভাড়া খরচ হয়েছে, তাও উঠবে না।
ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনছেন ১০০-২৫০ টাকায়
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ চৌমুহনী মোড়। প্রতিবারের মতো এবারও রাস্তার পাশে চামড়ার স্তুপ। একটি-দুটি করে চামড়া এনে এখানে বিক্রি করছেন লোকজন। ব্যাটারিচালিত রিকশাযোগে মধ্যবয়সি একজন নিয়ে এলেন দুটি বড় চামড়া। তার নাম আতিকুর রহমান।
এসময় প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে বসা ছিল চামড়া ক্রেতা মো. দুলাল। তিনি চামড়া রিকশা থেকে নামানোর পর প্রথমে ৪০০ টাকা দিলেন আতিককে। আতিকের জবাব, চামড়া ও টাকা দুইটা রেখে দে তুই। দুলাল আর ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে নিজের ডায়েরি খুলে দেখালেন। দেখ, কত টাকা করে চামড়া কিনেছি। তোমাকে বেশি দিলাম।
এভাবে খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি চামড়া ১০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে চট্টগ্রামে। পাড়া থেকে চামড়া সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রথম দফায় বিক্রি করছেন বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে। সেখান থেকে যাচ্ছে নগরের আতুরার ডিপোর আড়তদারদের কাছে। তবে চামড়ার আগের সেই জৌলুস এখন নেই বলে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব পক্ষ স্বীকার করছেন।
নগরীর চৌমুহনী মোড়ে চামড়া নিয়ে বসেছেন ৭-৮ জন। সেখানে পাড়া থেকে চামড়া সংগ্রহ করে এনে দিচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। দুজন মৌসুমি ব্যবসায়ী জানালেন, চামড়ার দাম এখন খুব কম। গাড়ি ভাড়া ওঠে না। বড় চামড়া ২০০-২৫০ টাকার বেশি দিচ্ছেন না ক্রেতারা।
একই চিত্র আড়তেও
হাটহাজারী উপজেলার একটি মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মো. আলী চট্টগ্রামের চামড়ার আড়ত আতুরার ডিপোতে এসেছেন কোরবানিদাতাদের সওয়াবের উদ্দেশে দান করা ২৯টি ছোট-বড় গরুর চামড়া নিয়ে। বিক্রির পর মাওলানা আলী গণনা করতে শুরু করেন খরচ।
তিনি বলেন, চামড়ার গাড়ি ভাড়া খরচ আড়াই হাজার টাকার বিপরীতে বিক্রয়মূল্য মাত্র তিন হাজার টাকা। আমরা যারা সারাদিন এসব চামড়া নিয়ে কাজ করেছি, সবই বৃথা। বৃথা শুধু তাদের পরিশ্রমই নয় বৃথা হয়েছে কোরবানিদাতাদের দাতব্যের আবেগও।
খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে একটি মাদরাসার প্রায় ছয়শো চামড়া নিয়ে এসেছেন মো. করিম। যিনি এই চামড়াগুলোর দেখাশোনা করছেন। অবাক হয়ে তিনি বললেন, এখানে ১০০ টাকার বেশি কেউ দাম দিতে চাইছে না। এই একটি বাক্যেই চামড়ার বাজারের সম্পূর্ণ বাস্তবতা ধরা পড়ে।
শুক্রবার (২৯ মে) আরাফাত নামে একজন আতুরার ডিপো এলাকায় বসে আছেন চামড়া নিয়ে। তিনি ২২টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। আড়তদাররা চামড়াগুলোর মূল্য বলছেন ২৫০০ টাকা। তিনি জানান, তাঁর প্রতিটি চামড়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেনা পড়েছে। কিছুটা বেশিতে বিক্রি করতে না পারলে লোকসান হবে।
মো. আলম নামের একজন ব্যবসায়ী আতুরার ডিপোতে দাঁড়িয়ে আছেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি বলেন, গ্রামের বাজার থেকে একটি বড় গরুর চামড়া কিনেছেন ৪০০ টাকার কাছাকাছি দামে। তার উপর আছে গাড়ি ভাড়া, শ্রমিক খরচ। এখানে এসে আড়তদাররা ২০০ টাকার বেশি দাম দিতে চাইছেন না। তার প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গত: ‘তাহলে আমরা কীভাবে টিকব?’
বাঁশখালী থেকে আসা রুবেলের গল্প একই রকম হতাশায় ভরা। তিনি বলেন, ঈদের সময় একটু লাভের আশায় চামড়ার ব্যবসায় নামি। কিন্তু প্রতিবছরই লোকসান গুনতে হয়। এবারও সেই অবস্থা। আর এই অবস্থা কোনো নতুন নয় এটি বছরের পর বছর চলে আসা একটি দুষ্ট চক্র।

মূল্যহীন সরকারি মূল্যও
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার ঢাকার বাইরের জন্য প্রতি ফুট লবণযুক্ত চামড়া ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। ঢাকায় যা ৬২ থেকে ৬৭ টাকা। কিন্তু সরকারি এই মূল্য চট্টগ্রামে মূল্যহীন। চট্টগ্রামের আড়তদার সমিতির ৩৫ সক্রিয় সদস্য সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। যাদের প্রায় ১৫০ সংগ্রহকারী চামড়া ক্রয়ে একরকম মূল্যই বলছেন।
গড়ে প্রতিটি ছোট গরুর চামড়া ১০০-১৫০ টাকা, আর বড় গরুর চামড়া ২৫০-৩০০ টাকায় কিনছেন। বিষয়টি স্বীকার করেছেন চামড়া আড়তদার সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিনও। তিনি বলেন, চামড়ার আগের জৌলুস নেই। এখন চামড়ার দাম খুব কম। খরচ এবং কেনা মিলে লাভ করা কঠিন। আমরা আগেই মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চামড়া সংগ্রহের সময় দাম বুঝে কিনতে বলেছিলাম। যারা না বুঝে কিনবেন, তারা ঠকবেন।
কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন একটি চামড়া প্রক্রিয়াকরণের খরচের হিসাব দেন। সংগ্রহ, পরিষ্কার, লবণ দেওয়া, সংরক্ষণ সবকিছু মিলিয়ে শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচই পড়ে প্রায় ৪৫০ টাকা। এরপর আসে ঝুঁকি, পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ ঝামেলা।
আর তারপর? তারপর আসে ট্যানারি। যেখানে চাহিদা নেই, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম পড়ছে, যেখানে অর্থ প্রদান হচ্ছে দেরিতে। এর ফলে পুরো বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আর সেই অস্থিরতার বিষফল ছড়িয়ে পড়ে শিল্পের প্রতিটি স্তরে।
চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির তথ্যমতে, এবারের লক্ষ্য গরু-মহিষের সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ চামড়া সংগ্রহ। বৃহ¯পতিবার বিকেল হতে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া আড়তে আসা শুরু হয়। তার আগে চৌমুহনী বাজারসহ নগরের বিভিন্ন স্থানে চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
উৎসবের রূপান্তর
চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী তালুকদার এহছানুল হক। তিনি বলেন, ২০১০ সালের আগেও কোরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহ ছিল লাভজনক ব্যবসা। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আসতেন আশা নিয়ে, ফিরে যেতেন লাভ নিয়ে। সেই দিনগুলো এখন অতীত।
তিনি বলেন, এ সময় ৩০ হাজার টাকায় গরু কিনলে সেই চামড়ার দাম দেড় হাজার টাকায় কেনা হতো। তখন গরুর চামড়ার দাম সরকারিভাবে ছিল বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক কম। এখন দেড় লাখ টাকার গরুর চামড়াও বিক্রয় হচ্ছে ১০০ টাকায়।
নগরীর পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা তারেক কোম্পানী বলেন, এবার আাম এক লাখ ৭০ হাজার ও এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা দিয়ে দুটি গরু কোরবানি দিয়েছি। কিন্তু চামড়া বিক্রি করতে পারিনি। ফৃতে মাদরাসায় দিয়ে দিয়েছি। অথচ এক সময় ৩০ হাজার টাকায় কেনা গরুর চামড়াও বিক্রি করেছেন ১০০০-১৫০০ টাকায়।
চট্টগ্রাম মহানগরীর পুরাতন চামড়া ব্যবসায়ী হাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। কিন্তু এই খাতটা এখনো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়নি। চামড়া শিল্পের এই সংকট শুধু চামড়ার সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি সমাজের একটি বিস্তৃত সমস্যার প্রতিফলন দাম নিয়ন্ত্রণের অভাব, সিন্ডিকেটের খেলা, অরাজকতা।
নৈরাজ্য দিয়ে বাণিজ্য
বাজারে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। জুতো, ব্যাগ, ওয়ালেট এসবের দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু কাঁচা চামড়ার দাম গড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা আলাউদ্দিন তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, আগে চামড়ার দাম বেশি ছিল কিন্তু চামড়াজাত পণ্যের দাম ছিল কম। এখন সময়ের ব্যবধানে চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে কিন্তু কাঁচা চামড়ার কোনো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এবার চামড়ার দামও গত বছরের চেয়ে বাড়িয়েছে সরকার। কিন্তু আড়তগুলো আরও কম দামে চামড়া খরিদ করতে চাইছে।
যা করতে হবে
সংশিাষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সরকারি নজরদারি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা যা বিদেশী মানদণ্ড অনুসরণ করা, ট্যানারি মালিকদের সাথে সমন্বিত উদ্যোগ যাতে চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য রাখা যায়।
কিন্তু এসবের কোনোটি নজরে পড়ছে না। ফলে বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও লোকসানের বোঝা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।
এএইচ