২৯ মে ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
ঈদ মানেই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক পুনর্মিলনের এক অনন্য উপলক্ষ। বছরজুড়ে শহরের ব্যস্ততা ও যান্ত্রিক জীবনে আটকে থাকা মানুষ ঈদের ছুটিতে ছুটে যান নিজের শেকড়ে। আর এই ঘরমুখো মানুষের ঢল শুধু পারিবারিক আনন্দই বাড়ায় না, নতুন প্রাণ জোগায় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও।
ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই দেশের মহাসড়ক, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোতে শুরু হয় মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। যা ঈদের পরদিন শুক্রবারও অভ্যাহত ছিল। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর থেকে লাখো মানুষ যখন গ্রামের পথে যাত্রা করেন, তখন গ্রামীণ বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো চাঙা হয়ে ওঠে।
হাতিয়ার জাহাজমারা বাসস্ট্যান্ড এলাকার মুদি দোকানি মো. হাসান বলেন, ‘সারা বছর যে বিক্রি হয়, ঈদের আগে-পরে কয়েক দিনে তার চেয়ে অনেক বেশি বেচাকেনা হয়। শহর থেকে যাঁরা আসেন, তারা ভালো বাজার করেন এবং আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে কেনাকাটা করেন।’
ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জনপদের কাপড়ের দোকান, কসমেটিকস, মিষ্টি ও জুতার দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে। স্থানীয় দর্জিরাও নতুন পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন। শুধু ব্যবসাই নয়, গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থাও এ সময় প্রাণ ফিরে পায়। জাহাজমারা-নিঝুমদ্বীপ মুক্তারিয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন রুটের ভ্যানচালক, অটোরিকশা চালক ও নৌকার মাঝিরা বাড়তি যাত্রী পেয়ে ভালো আয় করেন।
শহর থেকে আসা মানুষের ব্যয়ের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বড় সহায়ক হয়। তবে এই আনন্দের মধ্যেও অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, যানজট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পাশাপাশি কিছু সামাজিক রেওয়াজ ও অর্থনৈতিক চাপ অনেকের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অসচ্ছল পরিবারের অনেকেই ঋণ করে হলেও মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে খাসি ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী পাঠান। চৌমুহনী বাজারে কাসেম নামের এক ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলছিলেন, ‘আমি কোরবানি করেনি এবার, তবে ১১ হাজার টাকা দিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে খাসি পাঠিয়েছি।’
ঈদের আগের দিন সকালে শহর থেকে নলচিরা নৌ-ঘাটে নামা উপজেলার লক্ষ্মীদিয়া গ্রামের বেসরকারি চাকরিজীবী সোলাইমান বলেন, বেতনের সঙ্গে সংসার খরচের মিল নেই, তার পরও কষ্ট করে হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দে শরিক হতে বাড়ি এসেছেন।
এর মধ্যেই চরম অর্থকষ্টে ঈদ কাটানোর কথা জানিয়েছেন হাতিয়া উপজেলা পোস্ট অফিসের এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল (ইডি) কর্মচারীরা। তারা জানান, উপজেলায় তাদের প্রায় ৪০ জন কর্মচারী রয়েছেন, যার মধ্যে ২৫ জন মুসলিম। অথচ তাদের মাসিক বেতন মাত্র ৪ হাজার টাকা। এই সামান্য বেতনে উৎসব করা তো দূরের কথা, সংসার চালানোই বড্ড কষ্টের। তাই তারা সরকারের সদয় দৃষ্টি কামনা করেছেন।

তবুও ৪ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারীদের এই কষ্ট ও সমাজের নানা সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে ঈদের এই ঘরমুখো যাত্রা মানুষকে টেনে নেয় আপন ঠিকানায়। কারণ, ঈদের আনন্দের বড় একটি অংশ জড়িয়ে আছে শেকড়ের সঙ্গে। আর সেই শেকড়েই প্রতি বছর নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় গ্রামীণ অর্থনীতি ও উৎসবের আবহ।
প্রতিনিধি/একেবি