images

সারাদেশ

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প উদ্বোধন নিয়ে সংশয়  

২৫ মে ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

একে-৪৭ ও অত্যাধুনিক পিস্তল নিয়ে হামলা চালিয়ে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সদ্য স্থাপিত যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এস্কেভেটর দিয়ে এই ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্যাম্পটি আগামী ৩১ মে উদ্বোধন করার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের। এতেই ক্ষোভ তৈরি হয় আওয়ামী লীগ মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের মাঝে। ফলে এই হামলাকে সরকারের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তেমনটাই মনে করছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমও।

সোমবার (২৫ মে) দুপুরে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, ‘এই হামলায় জড়িত ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনের পেছনে রাজনৈতিক কোনো ব্যাকআপ আছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আশা করছি আমরা সফল হবো।’

তিনি বলেন, ইয়াসিন বাহিনীর ৩০০ সদস্য একে-৪৭ ও অত্যাধুনিক পিস্তল নিয়ে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। যা ক্যাম্পে থাকা যৌথবাহিনীর ১৫০ সদস্যের কাছেও ছিল না। তারা রাইফেল, টিয়ারশেল ও শটগানের গুলি ছুড়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করেছে। সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র কীভাবে এবং কোথা থেকে পেল, তা বের করা হবে।

সূত্র জানায়, হামলার সময় সন্ত্রাসীরা যৌথবাহিনীর ওপর একদিকে গুলি ছুড়ছিল, অন্যদিকে এস্কেভেটর দিয়ে নির্মাণাধীন ক্যাম্পের অবকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিকও সেখানে ছিলেন। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের এই ক্যাম্প উদ্বোধনের কথা রয়েছে। এ অবস্থায় ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের যৌথবাহিনীর ক্যাম্প উদ্বোধন কর্মসূচি বহাল থাকছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তবে র‍্যাব-৭ অধিনায়ক ও এসপি উভয়েই জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মসূচি পালন করা যাবে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি হতে তারা দেবেন না।

প্রত্যক্ষদর্শী নির্মাণ শ্রমিক হৃদয় ইসলাম বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা প্রথমে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি শুরু করে। তারপর দুই দিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আসতে থাকে। মোটরবাইকেও কয়েকজন আসে। অনেকের হাতে পিস্তল আর কিরিচ দেখেছি। ট্রাক আর এস্কেভেটরও নিয়ে আসে। আমরা দোকানের ভেতর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সাতজন ছিলাম। তিনজন ড্রেনের ভেতরে ঢুকে পড়ে আর চারজন দোকানের ভেতরে বসে থাকি। কয়েকজন সন্ত্রাসী দোকানের ভেতরে ঢুকে আমাদের মারধর করে ৪০ হাজার টাকার মতো আর সবার মোবাইলগুলো নিয়ে চলে যায়।’

আরেক নির্মাণ শ্রমিক বলেন, ‘এস্কেভেটর দিয়ে আমাদের তৈরি করা ক্যাম্পটা একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। তবে আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন। আমরা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।’

এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, পুলিশ ও র‍্যাবের সদস্যরাও সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলিবর্ষণ করেন। সন্ত্রাসীরা দুটি মোটরবাইক ফেলে যায়। উত্তেজিত পুলিশ সদস্যরা একটি মোটরবাইকে আগুন ধরিয়ে দেন এবং আরেকটি ভাঙচুর করেন।

নীরব নামে আরেকজন নির্মাণ শ্রমিক আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, ‘ইয়াসিন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। এলাকার লোকজন জড়িত ছিল। কারণ এখানে প্রতিদিন দোকানপাট বন্ধ হয় রাত ১২টা-১টার দিকে। কিন্তু রোববার রাতে ১০টার মধ্যে সব বন্ধ হয়ে যায়। আমরা কয়েকজন পুলিশ ভাইসহ রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিগারেট কিনতে সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডে যাই। সেখানে ৫-৬ জন লোক দেখি। তাদের কাছে যে অস্ত্র আছে, সেটা আমরা বুঝতে পারি। আগের দিন এলাকার কয়েকজন লোক এসে আমাদের ভিডিও করে। তারা হুমকি দেয়, প্রত্যেকজনকে দেখে নেবে বলে।’

নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এপিবিএনের এক সদস্য বলেন, ‘রাত ১টার পর হবে। আমরা ১৭ জন ডিউটি করছিলাম। হঠাৎ দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আমরাও গুলি ছুড়তে ছুড়তে দক্ষিণ দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে শত শত সন্ত্রাসী তখন গুলিবর্ষণ করতে করতে আমাদের দিকে আসতে থাকে। আমরা অস্ত্রধারীদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাই। তখন প্রাণভয়ে আমরা যে যেদিকে পেরেছি, সেদিকে চলে যাই।’

এপিবিএনের আরেক সদস্য বলেন, ‘ক্যাম্পের সামনে থাকা এক দোকানের মালিকের ছেলেকে আমরা চিনি। সবসময় এখানে দেখি। রোববার হামলার সময় তাকেও দেখলাম অস্ত্র হাতে। এখানে ইয়াসিন বাহিনী বলতে আলাদা কোনো বাহিনী নেই। এলাকার সব লোকজনই ইয়াসিন বাহিনী। ইয়াসিনের কথাই এখানে আইন।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জঙ্গল সলিমপুরের প্রধান সড়কের ৩-৪ জায়গায় সন্ত্রাসীরা রাস্তা কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে হামলা শুরু করে। সীতাকুণ্ড থানা থেকে পুলিশ দ্রুত রওনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে হামলাকারীরা আলীনগরে নতুন নির্মিত ক্যাম্পের দিকে চলে যায় এবং সেখানে আক্রমণ করে।

যৌথ বাহিনীর তথ্যমতে, আলীনগর স্কুলে আরেকটি ক্যাম্পে যৌথবাহিনীর ১৫০ সদস্য ছিলেন। তারা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের ১০৫ রাউন্ড গুলি ছুড়তে হয়েছে। পুলিশের শক্ত প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা টিকতে না পেরে দ্রুত পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়।

দেড় ঘণ্টা ধরে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলে বলে জানালেন র‍্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান। 

তিনি বলেন, ‘এস্কেভেটরগুলো সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি সরু পথ দিয়ে নিয়ে আসে। সেজন্য এই তথ্য আমরা আগেভাগে পাইনি। তারা চারদিক থেকে গুলি, ককটেল ছুড়ে হঠাৎ আক্রমণ শুরু করে। তারা একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করেছে। আমাদের পক্ষ থেকে টিয়ারশেল ও শটগানের বুলেট এবং অল্প কিছু রাইফেল দিয়ে ফায়ার করা হয়েছে।’ পাল্টাপাল্টি আক্রমণে যৌথবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তেমন কেউ আহত হননি বলে জানান এই র‍্যাব কর্মকর্তা।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৩ হাজার ২০০ একর আয়তনের পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যেন ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’। ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধীদের আস্তানা খ্যাত এই জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য র‍্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর একটি ক্যাম্প ৩১ মে উদ্বোধন করার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের। আর রাতের অন্ধকারে তিন শতাধিক সন্ত্রাসী গুলি ছুড়তে ছুড়তে আক্রমণ করে সেই ক্যাম্পে। এস্কেভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ক্যাম্পটি। এর আগে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়। কিন্তু চারদিক ঘিরে হঠাৎ আক্রমণের মুখে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

র‍্যাব এ ঘটনার জন্য মো. ইয়াসিনের নেতৃত্বাধীন ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যও তাই। প্রশ্ন উঠেছে, এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করল কি না। র‍্যাব কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সন্ত্রাসীরা অবশ্যই সরকারকে বিব্রত করার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে। হামলার পর যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ২৫ জনকে আটক করেছে। সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া ২টি মোটরবাইক, ২টি এস্কেভেটর ও ১টি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, একসময় ইয়াসিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল শুধুমাত্র আলীনগর এলাকা। এখন পুরো জঙ্গল সলিমপুরই ইয়াসিনের নিয়ন্ত্রণে। গত ১৯ জানুয়ারি ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার অভিযানে গিয়ে বেধড়ক পিটুনিতে প্রাণ হারান র‍্যাব-৭ এর গোয়েন্দা টিমের প্রধান নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। আহত হন আরও তিন র‍্যাব সদস্য।

এরপর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ মিলে ২০০ সদস্যের বিশাল যৌথবাহিনী সেখানে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে বলে ঘোষণা দেয়। যৌথবাহিনীর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া পুলিশ একাডেমি, কারাগারসহ আরও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।

অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোর মধ্যে একটি আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন এক ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে জেলা পুলিশ, এপিবিএন, আরআরএফ ও র‍্যাব মিলে ১৫০ সদস্য নিয়মিত অবস্থান করেন। রোববার রাতে হামলার সময় এস্কেভেটর দিয়ে সেই অবকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা।

সোমবার (২৫ মে) সকালে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বায়েজিদ লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে খেজুরতলা এলাকায় দুই স্থানে, এর আধা কিলোমিটার দূরে পাথরিঘোনা এলাকা এবং আরও এক কিলোমিটার পরে আলীনগর চৌরাস্তার মোড়ে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। সেখানে পথচারীদের হেঁটে পারাপারেও যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।

আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে পূর্বে ৫০ গজের মতো গেলে যৌথবাহিনীর নতুন সার্বক্ষণিক ক্যাম্পটি গড়ে তোলা হয়েছিল। পাকা পিলারের সঙ্গে চারদিকে টিনের ঘেরা দিয়ে ক্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়। পুলিশ ও নির্মাণ শ্রমিকরা জানান, গত ১ মে থেকে ক্যাম্পটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ করে আগামী মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিদায় নেওয়ার কথা ছিল।

প্রতিনিধি/একেবি