images

সারাদেশ

বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক সংকটে চামড়া শিল্পে অনিশ্চয়তা

২৫ মে ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

সাভারে ট্যানারি শিল্পে একের পর এক সংকটের কারণে এবারও কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা। বিদ্যুৎ সংকট, রাসায়নিকের মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি প্রণোদনা না পাওয়া, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিইটিপি না থাকা এবং চীনা ক্রেতাদের দামের সিন্ডিকেট ব মিলিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেশের অন্যতম রফতানিমুখী এই শিল্প।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত হিসেবে পরিচিত চামড়া শিল্প থেকে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে। জাতীয় অর্থনীতিতেও রয়েছে এর উল্লেখযোগ্য অবদান। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, নানা সমস্যায় ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এই শিল্প।

ট্যানারি মালিকরা জানান, কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট প্রক্রিয়াজাত চামড়া ২ থেকে আড়াই ডলারে বিক্রি হতো। এখন সেই একই চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ সেন্টে। ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাভারের হেমায়েতপুরে থাকা ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র একটি কারখানার এই সনদ রয়েছে।

মালিকদের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ সিইটিপি চালু না হওয়া এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। এতে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা আগ্রহ হারালেও চীনের কিছু ব্যবসায়ী কম দামে চামড়া কিনে নিচ্ছেন।

হেমায়েতপুরের মদিনা ট্যানারির মালিক নুর মোহাম্মদ বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পর থেকেই ব্যবসায় ধস নেমেছে। একটি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে যেখানে প্রায় ৮০ সেন্ট খরচ হয়, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ সেন্টে। গত এক দশকে তিনি প্রায় শত কোটি টাকার লোকসানে পড়েছেন বলেও দাবি করেন।

tanary

তিনি আরও বলেন, আগে বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা এলেও এখন মূলত চীনা ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারা সিন্ডিকেট করে কম দামে চামড়া কিনছে। বাজারে বিকল্প ক্রেতা না থাকায় বাধ্য হয়েই সেই দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবিএস ট্যানারির ওয়েট ব্লু কন্টাক্টর আব্দুর রহিম জানান, চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে ড্রামের ভেতরের চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তাই ঈদের পর অন্তত কয়েক মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান তারা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ট্যানারি শিল্পে একবার উৎপাদন শুরু হলে টানা ১৬ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গত এক মাস ধরে উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে আছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবেও পুরোনো ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে এবং নতুন অর্ডারও মিলছে না বলে জানান তিনি। এতে আগের উৎপাদিত চামড়া গুদামেই পড়ে আছে।

রাসায়নিক সংকটও ট্যানারি মালিকদের নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সালফিউরিক এসিডের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আগে যে এসিড ৩৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ২৩৫ থেকে ২৫০ টাকা দরে। অথচ এই রাসায়নিক ছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, চামড়া খাতে ঘোষিত ২০০ কোটি টাকার সরকারি প্রণোদনাও এখনও পাননি মালিকরা। ব্যাংকগুলোও সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। এবিএস ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাম হোসেন বলেন, আর্থিক সহায়তা ছাড়া চামড়া কেনা সম্ভব নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে চললেও ব্যাংকগুলো সহযোগিতা করছে না।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, সরকার ঘোষিত প্রণোদনার টাকা ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে খাতটি বড় সংকটে পড়েছে। পোশাক শিল্পের মতো দ্রুত প্রণোদনা পেলে ট্যানারি শিল্পও কিছুটা স্বস্তি পেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

tanary

এদিকে, চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ লাখ পিস কম চামড়া সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। পাশাপাশি ঈদের পর প্রথম ১০ দিন ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, এতে অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমবে এবং সীমিত সক্ষমতায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হবে।

প্রতিনিধি/একেবি