জেলা প্রতিনিধি
২৩ মে ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম
‘সামনে কোরবানির ঈদ, তাই এক সপ্তাহ আগে মায়ের পীড়াপীড়িতে একটি বটি দা বানানোর অর্ডার দিয়েছিলাম। আজ শনিবার (২৩ মে) দুপুরে ডেলিভারি দেওয়ার ডেইট, তাই দা'টা নিতে এলাম গোকর্ণ গ্রামের কামারপাড়ায়। আর বাকি ছুরি, টাকসাল যা-কিছু লাগে মার্কেট থেকে কিনে নেব। মার্কেটের জিনিসগুলো অনেক আধুনিক। দামেও সস্তা।’
কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাজীপাড়ার রফিকুল ইসলাম।
পৌর এলাকার গোকর্ণ গ্রামের গনেষ কর্মকার (৫৫) পিতৃহারা হন দশ বছর আগে। এরপর মা, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। সংসার চালাতে প্রতি মাসে তার ব্যয় হয় ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বাপ-দাদার পেশা কামার শিল্পকে আঁকড়ে ধরে ঠিকমতো সংসারের খরচ যোগাতেই কষ্ট হয় তার। ধার-দেনায় জড়িয়ে কোনোমতে সংসারের ঘানি টানতে হয় গনেষকে।
গনেষ কর্মকারের মতো কামার শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেরই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে তারা লাভের মুখ দেখতে পারছেন না।
গনেষ কর্মকার জানান, এখন আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে দা, ছুরিসহ বিভিন্ন লৌহযন্ত্র তৈরি করে বাজার দখল করে ফেলায় কামার শিল্পে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা পেশা বদলে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।
একই গ্রামের সুবল কর্মকার জানান, এক সময় কামার শিল্পের অনেক কদর ছিল। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে তাদের হাতে তৈরি দা, বটি, টাকশাল, ছুরি, কাস্তে, কোরাল, কোদাল, খুন্তি, শাবলসহ বিভিন্ন লৌহযন্ত্র কিনে নিয়ে যেতো। সেসময় তাদের সুখের দিন ছিল। আর এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় দুর্দিন তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। অপেক্ষাকৃত কম দামে এসব জিনিস বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে তাদের কদর অনেকটাই কমে গেছে।
গোকর্ণ গ্রামের কামারপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, সেখানকার বাসিন্দাদের মাঝে লোহার যন্ত্রপাতি নিয়ে কোনো ব্যস্ততা নেই। কোরবানির ঈদের আগমুহূর্তের এই সময়ে যেখানে তাদের দম ফেলার সময় থাকার কথা নয়, অথচ সেই পাড়া এখন নীরব-নিস্তব্ধ।
জানা গেছে, এ পাড়ায় ৪০টি কামার পরিবারের বসবাস। এখন হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারের লোক ছাড়া বাকিরা এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
হাতের তৈরি যন্ত্রপাতির দাম প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে প্রদীপ কর্মকার নামে আরেক কামার শিল্পী বলেন, লোহার ওজন অনুযায়ী যন্ত্রপাতি বিক্রি করেন তারা। এক কেজি ওজনের লোহার বটি দা এক পিস ৮০০ টাকা, টাকসাল মিডিয়াম এক পিস ৯০০ টাকা, ছুরি ২৫০/ ৩৫০ টাকা, বটি দা ৫০০ টাকা, কুপের দা ৬০০ টাকা।
সুধীর কর্মকার নামে ওই পাড়ার এক কামার শিল্পী বলেন, পাঁচ বছর আগেও পাইকাররা যে পরিমাণ কাজের অর্ডার দিতো, এখন এর অর্ধেকও দেয় না। গত বছর যা বিক্রি করেছি তার চেয়ে এবছরের অবস্থা আরও খারাপ যাচ্ছে।
তার দাবি, রুগ্ন এই শিল্পটিকে বাঁচাতে হলে বিদেশ থেকে আমদানি করা মালামালের ওপর আরোপিত করের (ট্যাক্স) দাম বাড়িয়ে দিতে হবে। তাছাড়া এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
প্রতিনিধি/জেবি