images

সারাদেশ

ভবঘুরে রুপার কোলজুড়ে পুত্র সন্তান, পিতৃপরিচয়ের আগেই পালিয়েছেন সাব্বির

জেলা প্রতিনিধি

২২ মে ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

মানবতা যে এখনো জীবন্ত, তারই এক বাস্তব উদাহরণ দেখা গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে। গভীর রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে অসহ্য প্রসব যন্ত্রণায় কাতর এক অসহায় মা মাহমুদা আক্তার রুপার (২০) পাশে দাঁড়ালেন চিকিৎসক, নার্স এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৃথিবীর আলো দেখল এক নবজাতক ছেলে শিশু। বর্তমানে মা ও সন্তান দু’জনেই সুস্থ আছেন।

শুক্রবার (২২ মে) ভোররাত আনুমানিক ৩টার দিকে হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি থাকা রুপার জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়। অপারেশন পরিচালনা করেন গাইনি কনসালটেন্ট ডা. কামরুন্নাহার বেগম এবং অ্যানেসথেসিয়ার দায়িত্ব পালন করেন ডা. হাবিবুর রহমান শামীম। অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত নার্স ও স্টাফরা সবাই ছিল আন্তরিক।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা জানান, গভীর রাতের ক্লান্তি ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যেও তারা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সফলভাবে সিজার সম্পন্ন করেন। এতে মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষা পায়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রুপার জন্ম কুমিল্লার বড়ুড়া উপজেলায় হলেও ছোটবেলা থেকেই তার বেড়ে ওঠা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলস্টেশন এলাকায়, যেখানে তিনি ভবঘুরে জীবনযাপন করতেন। সেখানেই তার পরিচয় হয় সাব্বির মিয়ার সঙ্গে। সাব্বির স্টেশনে তার মামা দিলু মিয়ার একটি দোকানে কাজ করতেন। পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যা পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের প্রেমে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সাব্বির রুপার সঙ্গে একাধিকবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রুপা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার না করে সাব্বির রুপাকে একা ফেলে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই চরম অসহায় অবস্থায় পড়ে যান রুপা। আশ্রয় হয়ে ওঠে আখাউড়া রেলস্টেশন। সেখানেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটাতে থাকেন তিনি। স্টেশনের অনেকেই রুপার এই হৃদয়বিদারক ও করুণ জীবনের গল্প জানেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তার সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে আছেন।

child

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত ৮টার দিকে প্রসব ব্যথা শুরু হলে প্রতিবেশী সুমা তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি করান। এ সময় রেলস্টেশন এলাকার কয়েকজনের কাছ থেকে চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহ করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, সেই টাকা চিকিৎসায় ব্যয় না করে সুমা নিজেই নিয়ে নেন এবং রুপাকে হাসপাতালে রেখেই চলে যান। রাত যত গভীর হচ্ছিল, ততই বাড়তে থাকে রুপার অসহ্য প্রসববেদনা। প্রথম সন্তান ও পূর্ণমেয়াদি গর্ভাবস্থার কারণে তিনি তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে হাসপাতালের নার্সরা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক প্রসবের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে চিকিৎসক, নার্স এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সম্মিলিত মানবিক উদ্যোগে রুপার পাশে দাঁড়ানো হয়। তাদের সহযোগিতায় রাতেই প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে এবং প্রসব ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হলে গাইনি চিকিৎসক ও নার্সরা জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। গভীর রাতে সফলভাবে রুপার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। পরে শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে নবজাতক শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী প্রদান করা হয়। পাশাপাশি সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মায়ের জন্যও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে রুপা ও তার নবজাতক পুত্র সন্তানের চিকিৎসা ও পরিচর্যা চলছে।

Batighor--

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, রাতে রুপাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দেন। নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না হওয়ায় গভীর রাতে জরুরি সিজার করা হয়। মা ও শিশু দু’জনেই সুস্থ আছেন। বাতিঘরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে।

Hospital

গাইনি বিভাগের ইনচার্জ মোছা. মর্জিনা বেগম বলেন, রুপা যখন ভর্তি হন তখন তার সঙ্গে কোনো আত্মীয় ছিল না। প্রথমে আমরা নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করি। পরে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে রাত ৩টার দিকে সিজার করা হয়। বর্তমানে মা ও নবজাতক দু’জনেই সুস্থ আছেন।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বাতিঘরের সহযোগিতায় অজ্ঞাত বা অসহায় রোগীদের চিকিৎসা অনেক সহজ হয়েছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালি বলেন, এর আগে গভীর রাতে এমন জরুরি সিজার হয়নি। মানবিক বিবেচনায় চিকিৎসক, নার্স ও অ্যানেসথেসিয়া টিমকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। হাসপাতাল থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম জানান, রাতেই জরুরি ভিত্তিতে সিজার সম্পন্ন হয়। মা ও শিশু দু’জনেই সুস্থ আছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস