জেলা প্রতিনিধি
২০ মে ২০২৬, ০৫:২১ পিএম
কোরবানির হাটের আমেজ চাঙ্গা করতে রাজবাড়ী জেলায় এখন সবার মুখে মুখে একটাই নাম—‘রাজাবাবু’। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে জেলার খামারিরা তাদের সেরা পশুগুলো প্রস্তুত করলেও, এবার সব নজর কেড়ে নিয়েছে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালন করা ৩৭ মণ ওজনের এই রাজকীয় ষাঁড়টি। ধবধবে সাদা আর কালো রঙের এই বিশাল আকৃতির, পরম যত্নে বড় হওয়া ‘রাজাবাবু’ ফ্রিজিয়ান জাতের গরুটির দাম হাঁকা হচ্ছে ১০ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কলিমহর ইউনিয়নের হোসেনডাঙ্গা গ্রামের খামারি মো. আলী শেখ বিগত তিন বছর ধরে ষাঁড়টিকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছেন। ভালোবেসে নাম রেখেছেন ‘রাজাবাবু’। অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের এই গরুর বর্তমান বয়স তিন বছর। ক্ষতিকর কোনো ওষুধ বা ইনজেকশন ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গম, ছোলা, চালের গুঁড়া, আলু ও সবুজ ঘাস খাইয়ে একে বড় করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতিদিন এই বিশাল ষাঁড়টিকে খাওয়াতেই খামারির খরচ হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা। রাজাবাবুর দেখভালে আলী শেখকে সাহায্য করেন তার ছেলে সাহেব আলী শেখ।
সরেজমিনে খামারে গিয়ে দেখা যায়, রাজাবাবুকে দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক দর্শনার্থীরা ভিড় জমাচ্ছেন।
খামারি মো. আলী শেখ বলেন, প্রায় দশ বছর আগে শখ করে খামার শুরু করেছিলাম। বর্তমানে খামারে গাভিসহ ৫টি গরু আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ৩৭ মণ ওজনের এই ‘রাজাবাবু’। দেশীয় পদ্ধতিতে পরম যত্নে ওকে বড় করেছি। এবারের ঈদে ১০ লাখ টাকায় রাজাবাবুকে বিক্রির আশা করছি।

বিশাল গরু নিয়ে খামারিরা যেমন আশাবাদী, তেমনি গো-খাদ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
সাহেব আলী শেখ জানান, বর্তমানে গো-খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী। যদি সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে গরু আসে, তবে দেশীয় খামারিরা চরম লোকসানের মুখে পড়বেন। তাই কোরবানির ঈদে যেন বাইরে থেকে কোনো গরু আমদানি করা না হয়, সে বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
প্রতিদিন ‘রাজাবাবু’কে দেখতে খামারে ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। এই বিশাল আকৃতির ষাঁড়টি দেখে দর্শনার্থীদের চোখে-মুখে ছিল বিস্ময় আর কৌতূহল।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী আল-আমিন হোসেন বলেন, আমি ফেসবুক ও মানুষের মুখে শুনে পাংশা থেকে বন্ধুদের সাথে নিয়ে রাজাবাবুকে দেখতে এসেছি। আমাদের রাজবাড়ী জেলায় এত বড় এবং সুন্দর একটা গরু আছে, তা সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাস হতো না। রাজাবাবু সত্যিই রাজকীয়! ৩ বছরে একে এই পর্যায়ে নিয়ে আসা খামারি ভাইয়ের দারুণ এক সাফল্য।
পাশের গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক খামারি মো. সাজ্জাদ আলী বলেন, আমি নিজেও একসময় গরু লালন-পালন করেছি, তাই বুঝি একটি গরুকে ৩৭ মণ ওজনে নিয়ে যাওয়া কতটা কষ্টের আর ধৈর্যের ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোনো ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ওষুধ ছাড়া শুধু দেশীয় খাবার খাইয়ে এত বড় করা হয়েছে। খামারি আলী শেখ ও তার ছেলের এই নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
এনজিও কর্মী মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম বলেন, "বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা রাজাবাবুর কথা শুনে দেখার জন্য জেদ ধরেছিলো, তাই ওদের নিয়ে আসলাম। বিশাল সাইজের এই গরুটা দেখে বাচ্চারা তো অবাক। তবে এত বড় হলেও গরুটা কিন্তু বেশ শান্ত স্বভাবের। খামারি ভাই যেন এই কোরবানিতে তার কষ্টের সঠিক দাম পান সেই দোয়াই করি।"
ঢাকার ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি কোরবানির গরু কেনার উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়িতে এসেছি। রাজাবাবুর কথা শুনে দেখতে এলাম। ১০ লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন খামারি, এই বাজারের গো-খাদ্যের যে দাম, সেই হিসেবে দামটা যৌক্তিকই মনে হয়েছে। আমরা যারা বড় গরু কোরবানি দিতে পছন্দ করি, তাদের জন্য রাজাবাবু একটি পারফেক্ট পছন্দ।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এবার রাজবাড়ী জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক জেলার কোরবানির পশুর সার্বিক পরিসংখ্যান : গরু ২৯, ৯৮০টি, ছাগল ৩৮, ৪১৪টি, মহিষ ২৩৬টি, ভেড়া ও অন্যান্য ৪৮১ টি। জেলায় মোট চাহিদা ৫০,২৮৪ টি, উদ্বৃত্ত পশু (যা অন্য জেলায় যাবে) ১৮,৮২৭ টি।
রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, আমি নিজে পাংশার হোসেনডাঙ্গা গ্রামের আলী শেখের ৩৭ মণের ‘রাজাবাবু’কে দেখেছি। এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ক্ষেতের ঘাস ও প্রাকৃতিক খড়-ভুসি খেয়ে বড় হয়েছে। এবার জেলার প্রায় ৮ হাজার ৮৭২ জন খামারি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে ৭০ হাজারের বেশি পশু হৃষ্টপুষ্ট করেছেন। আমাদের জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সার্বক্ষণিক খামারিদের মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে পাশে রয়েছে।
উদ্বৃত্ত প্রায় ১৯ হাজার পশু ঢাকার কোরবানি পশুর বাজারসহ অন্যান্য জেলার চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রতিনিধি/ এজে