উপজেলা প্রতিনিধি
১৯ মে ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যান এলাকায় অব্যাহতভাবে চলছে বনভূমি উজাড়ের উৎসব। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তাদের গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা এবং অসাধু চক্রের সঙ্গে সখ্যতার সুযোগে প্রভাবশালীরা একের পর এক বনভূমি দখল ও ধ্বংস করে যাচ্ছে। যেভাবে জাহাজমারা রেঞ্জের সদর বিট বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে, ঠিক একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে চর ওসমান তথা নিঝুম দ্বীপের বনাঞ্চলও। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় উদ্যান এখন ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার জাহাজমারা রেঞ্জের চর ওসমান বিট তথা নিঝুম দ্বীপের ছোঁয়াখালি বনের নিম্নমাধ্যমিক হাইস্কুলের উত্তর পাশ এবং বাধারখালের আগায় ব্যাপক হারে গাছ কেটে ফেলছে বনদস্যু ও ভূমিদস্যুরা। বনভূমি পরিষ্কার করে সেখানে চাষাবাদ ও গৃহনির্মাণও করা হয়েছে।
এছাড়া, নিঝুম দ্বীপের ডুবাই খালের বস্তাখালি, গামছাখালি, হরিণ বাজার, চৌধুরী খালের আগা এবং ইসলামপুরের মোড়খালি এলাকায় ধাপে ধাপে গাছ কেটে বনভূমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতাধর চক্র দাগ প্রতি বিভিন্ন দামে এসব জমি বিক্রি করছে।

জাতীয় উদ্যানের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্তত ১৫ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে শত-শত হেক্টর বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। বনভূমি দখলকারীদের কাছে গাছ কাটার মেশিন রয়েছে। তারা দিন-রাত গাছ কেটে জমি পরিষ্কার করছে।
অভিযোগ রয়েছে, বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে মাঝেমধ্যে দায়সারা কয়েকটি মামলা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়। বন রক্ষক জাহিদ প্রামানিক প্রায়ই কর্মস্থলের বাইরে থাকেন এবং দায়িত্ব পালনে ছিলেন উদাসীন। বন অপরাধীদের সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল বলেও অভিযোগ করেন তারা। একই সঙ্গে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
আরও পড়ুন
জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালে হাতিয়া আসনে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চল পরিদর্শন করে বন কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। এরপর থেকে বনদস্যুচক্র তার বিরোধিতা শুরু করে।

নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের সদস্য ও এনসিপি নেতা ছালাউদ্দিন বলেন, বর্তমান ক্ষমতাধরেরা বন কাটার অপরাধে জড়িত। তারা কৃষকদের কাছ থেকে ফসলের ভাগ নেয়, ভূমি ও নদী দখল করে এবং মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি চালায়।
তিনি আরও বলেন, রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা, উদাসীনতা এবং অপরাধীদের সঙ্গে সখ্যতার কারণেই বনের ক্ষতি বেড়েই চলছে। তবে তিনি বা তার অনুসারীরা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আশরাফ বলেন, থানা রোডের পাশে খানাখন্দ ভরাটের সময় কিছু গাছ কাটা হয়েছে। তবে বন রক্ষকদের গাফিলতি নেই।
বিএনপি নেতা শাহেদ মেম্বার ও ইব্রাহিম পার্টির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।

এর আগে জাতীয় উদ্যানের চর ইউনুসের আমতলী প্রজেক্ট (টুয়াচর) ও রাস্তার চর এলাকায় মাইলের পর মাইল বনভূমি উজাড়ের ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। যা এখন বিরাণভূমির আকার ধারণ করেছে। এ অপরাধের সাথে আমতলী বাজার কমিটির দুইজনসহ জাহাজমারা ইউনিয়নের ৩ ও ৯ নং ওয়ার্ডের অন্তত ৫৫ থেকে ৬০জন নারী-পুরুষ যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় ও বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়। যাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জাহাজমারা রেঞ্জ কর্মকর্তা ও চর ওসমান (নিঝুম দ্বীপ) বিট কর্মকর্তা মো. জাহিদ প্রামানিক বলেন, এত বড় চর, সবদিকে নজর রাখা সম্ভব হয় না। যারা নতুন করে গাছ কাটছে, অনুসন্ধান করে তাদের নাম পরে জানানো হবে। তবে তিনি দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেন।
উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম জানান, সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার সাথে জড়িতের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এবং বনের দায়িত্বশীলদের গাফিলতি কিংবা অনিয়ম খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বনবিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সূত্রে জানা যায়, জাহাজমারা রেঞ্জের ৪টি বিটের আওতায় ১৩টি চরে সরকারি গেজেটভুক্ত প্রায় ২১ হাজার ৪৪ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। এছাড়া ১১টি চরে সরকারি গেজেটভুক্ত ৪০ হাজার ৩৯০ একর এলাকা নিয়ে গঠিত নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ এলাকাকে “নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান” ঘোষণা করে।
হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল হাতিয়া উপজেলাধীন নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে। কিন্তু বাস্তবে এ কমিটির কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় উদ্যানের সরকারি গেজেটভুক্ত চর ইউনুস কে চর হেয়ার ও নতুন সুখচর নামকরণসহ বিভিন্ন চরকে নতুন নামে চিহ্নিত করে ভূমি অফিস হাত নকশা তৈরি করে বন্দোবস্ত দেয়। এতে ভূমিখেকোরা বনভূমি দখলের সুযোগ পায়। টাস্কফোর্স গঠনের পরও ভূমি অফিস কর্তৃক বন্দোবস্ত দেওয়া বনভূমির মধ্যে চর কালামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় চার মাস আগে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। চর ইউনুস এলাকায় ১৭৪, ১৭৫, ১৫০, ১৫১, ১৫৩, ১৫৪ ও ১৫৯ নম্বর খতিয়ানসহ অসংখ্য খতিয়ান খুলে বন্দোবস্ত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
টাস্কফোর্স কমিটির সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল। সভায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগ যৌথভাবে সরেজমিনে তদন্ত করে জবরদখলকারীদের তালিকা প্রস্তুত এবং দখলকৃত ভূমির পরিমাণ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। একইসঙ্গে সংরক্ষিত বনের সীমানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় ভূমি অফিসকে নতুন বন্দোবস্ত না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং বন্দোবস্তকৃত বনভূমি বুঝিয়ে না দিতে বলা হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের কিছুই মানা হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি/এসএস