জেলা প্রতিনিধি
১৯ মে ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
টানা বৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় আর সূর্যের অনুপস্থিতিতে নীলফামারীর কৃষকের ঘরে যেন নেমে এসেছে অঘোষিত অর্থনৈতিক সংকট। মাঠে ফলন ভালো হলেও বাজারে নেই স্বস্তি। ভুট্টা শুকাতে না পারায় পাইকার ও মহাজনরা কিনতে চাইছেন না, অন্যদিকে বোরো ধানের দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষকের চোখে এখন শুধুই হতাশা।
এক সময় যে ভুট্টা হয়ে উঠেছিল উত্তরাঞ্চলের কৃষকের “সোনালী স্বপ্ন”, সেই ভুট্টাই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে ভুট্টা বাড়িতে তোলার জন্য আবার কেউ কেউ এই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ঘরে তুলছেন ভুট্টা, কিন্তু বিক্রির বাজার নেই। রোদের দেখা না মেলায় ভুট্টার আর্দ্রতা কমছে না। ফলে গুদামে রাখা ভুট্টা দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচা বা আর্দ্র ভুট্টা কিনে সংরক্ষণ করলে বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকি থাকে। এ কারণেই তারা এখন অনেকটা দেখে শুনে ক্রয় করছেন।
ডোমারের কৃষক আজিমুল ইসলাম একজন সাধারণ কৃষক হাজারো কৃষকের মতো তারও একই গল্প। মৌসুমের শুরুতে যে ভুট্টার দাম ছিল প্রতি মণ ৯৫০ টাকা, তা নেমে এসেছে ৬৫০-৭০০ টাকায়। কিন্তু সেই দামেও মিলছে না ক্রেতা। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে বাড়ির উঠানে ত্রিপল টাঙিয়ে ভুট্টা শুকানোর চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে সামনে কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে অর্ধেক দামে ভুট্টা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে।

আরেক কৃষক সামিজুল ইসলাম বলেন, সার ও বীজের টাকা বাকি, ভুট্টা বিক্রি করে টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আকাশের যে অবস্থা, কোনো পাইকার এ ভুট্টা কিনতে চাচ্ছেন না। যদিও ২-১ জন আসে এমন দাম বলে যে খরচের টাকায় উঠবে না। এবার আকাশ হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমাদের করুণ দশা। সামনে কোরবানির ঈদ। ভাবছি ভুট্টা বিক্রি করে কোরবানিটা করব, কিন্তু তা এখন অনিশ্চিত।
নীলফামারীর অর্থনীতিতে ভুট্টা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় গত কয়েক বছরে কৃষকরা ধান ছেড়ে ভুট্টা চাষ করে আসছেন। জেলার বহু জমিতে বোরোর পরিবর্তে ভুট্টা আবাদ হয়েছে। কারণ ধানে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না।
কিন্তু এবার সেই লাভজনক ফসলও বৈরী আবহাওয়ার কাছে হার মানছে। মার্চ-এপ্রিলের আগাম ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে শত শত হেক্টর জমির ভুট্টা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক খেতেই গাছ হেলে পড়েছে।
এদিকে বোরো ধানের বাজার পরিস্থিতিও কৃষকদের জন্য আরও হতাশাজনক। মাঠে ফলন ভালো হলেও ধানের দাম পড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকার নির্ধারিত মূল্য পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক কৃষকের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও ধানের দাম না বাড়ায় সাধারণ কৃষকরা এখন হাঁটছে লোকসানের পথে।

কৃষক রমজান আলী বলেন, সংসারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে, সামনে কোরবানি। আরও পরিবারের খরচ। সব তো এই ধানের ওপরেই। আমাদের তো আর কোনো রাস্তা নেই। লাভ হোক আর লস হোক, এটা দেখবার সময় পাই কই, ধান কাটার কামলার টাকা দেওয়া লাগবে, ধান বিক্রি না কররে সেই টাকা কোথা থেকে দেই?
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা আশাবাদী, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে কৃষকদের প্রশ্ন সেই স্বাভাবিক সময় আসতে আসতে তাদের ঘরে কি আর স্বস্তি ফিরবে? কারণ প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে এখন তাদের বাড়ছে ঋণ, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের শঙ্কা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজারদর স্থিতিশীল হবে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে এবং ৩১ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষাবাদ হয়েছে। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো না পেলে ভুট্টার সঠিক আর্দ্রতা পাওয়া যায় না। এ কারণেই ভুট্টা ক্রেতারা জোরেশোরে কেনাকাটা শুরু করেনি। এদিকে কৃষকদের সহায়তায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৮টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে।
প্রতিনিধি/এসএস