১৯ মে ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে গরু চুরি। বিশেষ করে জেলার তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ও সলঙ্গায় প্রায় প্রতি রাতেই হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চোর চক্র। সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ভয়ে এখন লাঠি ও বাঁশি হাতে রাত জেগে গোয়াল পাহারা দিচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।
পুলিশ জানিয়েছে, গরু চুরি, ছিনতাই ও রাতের অপরাধ প্রতিরোধে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে জেলা পুলিশ। স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় ‘বাঁশকল’।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত ১০ মে গভীর রাতে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার পূর্ণীমাগাঁতী ইউনিয়নের পূর্বরামকৃষ্ণপুর গ্রামের ময়নুল ইসলামের খামারে হানা দেয় ১০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র। সবার মুখে গামছা আর হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চক্রটি একে একে ছয়টি গরু নিয়ে যাচ্ছে। শুধু ময়নুল ইসলামই নন, গবাদিপশু উৎপাদনে খ্যাত সিরাজগঞ্জে কোরবানি ঈদ ঘনিয়ে আসতেই তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ও সলঙ্গায় গরু চুরির ঘটনা এখন নিত্যদিনের। রাতের আঁধারে বিশেষ কায়দায় ট্রাকে করে গরু নিয়ে পালাচ্ছে চোরেরা। পরম যত্নে লালন-পালন করা পশুর সাথে খামারিদের স্বপ্নগুলোও যেন চুরি হয়ে যাচ্ছে।
গরু চুরি ঠেকাতে বাধ্য হয়ে দল বেঁধে পাহারা দিচ্ছেন খামারিরা। আর এসব অপরাধ প্রতিরোধেই এবার সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ নিয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘বাঁশকল’। সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে জেলা পুলিশের উদ্যোগে গঠন করা হয়েছে ২৫টি বিশেষ টিম। প্রতিটি টিমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বার, ইমাম-মোয়াজ্জিন ও যুবকসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনের ওপর রাখা হচ্ছে বিশেষ নজরদারি। প্রতি রাতেই দলবেঁধে হাতে বাঁশি, লাইট আর লাঠি নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন তারা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পালাক্রমে টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলাজুড়ে গরু চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক বাড়লেও পুলিশের এমন উদ্যোগে একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে বন্ধ হয়েছে গবাদিপশু চুরি এবং কমেছে মাদকসহ রাতের অপরাধ।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত ৫ মে গভীর রাতে কামারখন্দ উপজেলার বড়কুড়া মালোপাড়া, ছোট কুড়া ও নান্দিনা কামালিয়া গ্রামে এক রাতেই নয়টি গরু চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দা, খামারি, গ্রাম পুলিশ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পালাক্রমে চলছে রাতভর পাহারা। কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় গরুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে কয়েক গুণ। তাই নিজেদের উদ্যোগে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। এখন বাঁশকলের শব্দ মানেই পুরো গ্রামের জন্য সতর্ক সংকেত। এমনকি চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেও গরু চুরি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যমুনা চর এলাকার খামারিরা বলছেন, প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় চোর আতঙ্কে তারা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
খামারি রাকিব হোসেন, ময়নুল, আয়মনা বেগম ও নাসরিন জাহানসহ একাধিক খামারি বলেন, আগে রাত নামলেই গরু চুরির আতঙ্কে নির্ঘুম থাকতে হতো। তবে এলাকাবাসীর সম্মিলিত পাহারা ও পুলিশের তৎপরতায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। চোরচক্রও এখন এলাকায় ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। প্রতিটি এলাকায় রাতভর টহল জোরদার করা হয়েছে। কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে বাঁশকল বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে।
গরু চুরির শিকার কামারখন্দের বড় কুড়া গ্রামের খামারি রুহুল আমিন জানান, তার খামারে দুটি গাভী, একটি বকনা গরু ও একটি কোরবানির ষাঁড় ছিল। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ভোরে উঠে দেখেন খামারে একটি গরুও নেই। তার দাবি, চুরি হওয়া চারটি গরুর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। আরেক ভুক্তভোগী কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, গোয়ালে থাকা একটি গাভী, একটি বাছুর ও একটি বকনা গরু চুরি হয়ে গেছে। এতে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লিটন শেখ ও কৃষক সুমন শেখ বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও অনেক কৃষক বাড়তি লাভের আশায় দেশি গরু লালন-পালন করছেন। দিন-রাত পরিশ্রম করে বড় করা গরু চুরি হয়ে যাওয়ায় সবাই আতঙ্কে আছেন। তাই পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে আমরাও নিয়মিত পাহারায় অংশ নিচ্ছি।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাকিবুল হাসান বলেন, জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া অপরাধ দমন সম্ভব নয়। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. নাজরান রউফ জানান, মানুষের জানমাল রক্ষায় জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। কোনো অপরাধ বা সন্দেহজনক ঘটনা দেখলেই দ্রুত পুলিশকে জানাতে আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশকল এখন শুধু একটি সংকেত নয়, জেলার মানুষের ঐক্য, সচেতনতা ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, গরু চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি চোর চক্রকে ধরতে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয়দের সহায়তায় কমিটি গঠন ও বাঁশকল স্থাপন করে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখেই মূলত এই উদ্যোগ। জনগণকে সাথে নিয়ে গ্রহণ করা এমন উদ্যোগে ইতোমধ্যে সুফল মিলতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণে গরু চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবার চুরি অনেকটাই কমেছে বলে তিনি জানান।

তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, গত দুই মাসে জেলাজুড়ে অর্ধশতাধিক গরু চুরির ঘটনা ঘটেছে। দ্রুত এই চক্রকে দমন করা না গেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন সিরাজগঞ্জের খামারিরা।
প্রতিনিধি/একেবি