জেলা প্রতিনিধি
১৬ মে ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
ঠাকুরগাঁওয়ে সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ কনস্টেবলকে অপহরণ করে জিম্মি রেখে নির্যাতন ও চাঁদা দাবির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তরা কনস্টেবলকে মারধরের পাশাপাশি জোরপূর্বক ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় এবং বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়ারও চেষ্টা করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) দুপুরে গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনার পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন, অপরাধচক্র বা গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে রিমান্ড আবেদন প্রস্তুত করছে পুলিশ।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন— পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার লোহাগাড়া গ্রামের মো. শহিদ ইসলামের ছেলে মো. সোহেল রানা (৩২), গড়েয়া চোঙ্গাখাতা এলাকার আনজারুল ইসলামের ছেলে বিপ্লব ইসলাম (২৭), ঠাকুরগাঁও পৌরসভার গোবিন্দনগর জেলেশ্বরীতলা এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে নাজমুল হোসেন ওরফে রাব্বি (২২), জগন্নাথপুর হাজীর মোড় এলাকার বাহাদুর খানের ছেলে সাকিব খান (২৬) এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার কুড়েগ্রাম এলাকার আব্দুস সোবহানের ছেলে নাঈম আহম্মেদ (২৮)।
এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে ঠাকুরগাঁও সদর থানার কনস্টেবল মো. আজিজুল ইসলাম সাদা পোশাকে শহরের মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এসময় তিনি শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার পুরাতন ওয়ালটন সার্ভিস মোড় এলাকায় পৌঁছালে একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার ও অটোরিকশা নিয়ে একদল যুবক তার পথরোধ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে মারধর করা হয় এবং ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
পরে অপহরণকারীরা তাকে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী জেলা স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশে পঞ্চগড়-দিনাজপুর মহাসড়ক সংলগ্ন “সাকিব মটরস” নামের একটি দোকানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে অবরুদ্ধ করে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সিভিল পোশাকে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও সাকিব খান কনস্টেবল আজিজুল ইসলামকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেয়। তারা বলে, এই থানায় থাকতে হলে আমাদের চাঁদা দিতে হবে।
একপর্যায়ে জোর করে তিনটি ১০০ টাকার ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে সাকিব খান অন্যদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, “এই বেটা পুলিশকে ধর। আজকে পুলিশ মেরে দুপুরে ভাত খাবো।”
এরপর সোহেল রানা তাকে চড় মারেন এবং নাজমুল হোসেন ওরফে রাব্বি দোকানে থাকা শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে তার দুই পায়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
মামলায় আরও বলা হয়, এসময় নাঈমসহ আরও কয়েকজন তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানালে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আহত কনস্টেবল আজিজুল ইসলাম কৌশলে সেখান থেকে বের হয়ে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে তিনি সদর থানার ওসিকে বিষয়টি অবহিত করেন।
শুক্রবার (১৫ মে) তিনি বাদী হয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় সরকারি কাজে বাধা, অপহরণ, অবরুদ্ধ করে চাঁদা দাবি, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর-২৫।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হারুন অর রশিদ বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনরত একজন পুলিশ সদস্যের ওপর এমন বর্বর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মূল আসামিদের গ্রেফতার করেছে। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা চক্র জড়িত আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিনিধি/ এজে