১৬ মে ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে অবৈধ রেন্ট বাইক। দ্রুতগতি, হেলমেটবিহীন চলাচল এবং অদক্ষ চালকদের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হিমছড়ি ও ইনানী পুলিশ ফাঁড়িকে ‘ম্যানেজ’ করে মাসিক মাসোহারার ভিত্তিতে এই অবৈধ রেন্ট বাইক বাণিজ্য চলছে। নির্ধারিত মাসোহারা প্রদানকারী মোটরসাইকেলগুলোকে একটি বিশেষ ‘লোগো’ বা ‘চিহ্ন’ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই চিহ্ন থাকলে বাইকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জব্দ অভিযান পরিচালনা করা হয় না। অন্যদিকে, চিহ্নবিহীন মোটরসাইকেল পেলেই তা আটক করে মামলা দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, প্রতিটি বাইক থেকে মাসোহারা হিসেবে মাসে প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এই টাকার বিনিময়ে অবৈধ মোটরসাইকেলগুলো নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, হিমছড়ি ও ইনানী ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের ব্যবসা। এর মধ্যে অন্যতম 'রেন্ট বাইক সার্ভিস'। কলাতলী ডলফিন মোড়, সুগন্ধা পয়েন্ট ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের বিভিন্ন স্থানে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়াই মোটরসাইকেল ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। ঘণ্টাপ্রতি এসব বাইকের ভাড়া নেওয়া হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
পর্যটকদের অনেকেই শখের বশে কিংবা মোটরসাইকেল চালানো শেখার জন্য এসব বাইক ভাড়া নিচ্ছেন। তবে অপরিচিত সড়কে হেলমেটবিহীন অবস্থায় চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অনেকে। কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ আবার পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দুই বছরে এই রেন্ট বাইক সার্ভিস সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। বিশেষ করে স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও পর্যটকরা নিরিবিলি সড়ক হিসেবে মেরিন ড্রাইভকে বেছে নেওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এছাড়া দুর্ঘটনার পর পর্যটকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। সামান্য ক্ষতি হলেও কয়েক গুণ বেশি জরিমানা আদায় করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রহমান বলেন, ‘ইনানী ও হিমছড়ি ফাঁড়িকে ম্যানেজ করে মাসিক মাসোহারায় চলছে শত শত অবৈধ রেন্ট বাইক। এসব অবৈধ রেন্ট বাইক ব্যবসা বন্ধ করা উচিত। এই বাইকের কারণে শতশত তরুণ-তরুণী অকালে প্রাণ হারাচ্ছে।’
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক মুনির হাসান বলেন, ‘মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে মেরিন ড্রাইভ ঘুরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হই। বাইকের সামান্য ক্ষতি হওয়ায় আমাকে দ্বিগুণ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে পর্যটকদের জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয়।’
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, রেন্ট বাইক সার্ভিসের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। তারা দ্রুত এসব অবৈধ রেন্ট বাইক বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) সোমনাথ বলেন, ‘এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই। বিশেষ প্রয়োজনে মেরিন ড্রাইভে অভিযান পরিচালনা করা হয়। টাকার কোনো লেনদেন সম্পর্কে আমি জানি না।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশের সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। যানবাহনের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সংস্থাটির মূল দায়িত্ব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান রেন্ট বাইক নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) দুর্জয় সরকার বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভ রোডে আমার কোনো দায়িত্ব নেই। সেখানে আমার কোনো চেকপোস্টও নেই। আমার দায়িত্ব এলজিইডি সড়কে। মোটরসাইকেল সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।’

এদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ‘বিশেষ লোগোসংবলিত বাইক এবং সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত অভিযান পরিচালনা করব। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হবে।’
প্রতিনিধি/একেবি