নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ মে ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। পৃথিবীর দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন বিদেশি নাগরিকসহ দেশের ৬৪টি জেলার লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াত এই মহাসড়কে।
তবে এ পথে যাত্রীদের কাছে এখন আতঙ্কের নাম ‘মারছা’ পরিবহনের গাড়ি। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে অনেকেই এই গাড়িগুলোকে ‘আজরাইলের ছায়া’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
গত শনিবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় মারছা পরিবহনের দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনা যেন তারই প্রমাণ মেলে।
এ ঘটনায় আহত হন আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী। দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মারছা পরিবহন বয়কটের আহ্বান জানিয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করেন অনেকে। দুর্ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ফোর সিজন রেস্টুরেন্টের সামনে মারছা পরিবহনের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় জনতা।
আরিফুর রহমান নামে এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মারছা গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কি প্রশাসন দেশে নেই?’ মহাসড়কে চলাচলকারী এসব গাড়ি বন্ধে এলাকাবাসীর প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মো. ইলিয়াছ নামে এক ব্যক্তি বলেন, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। অদক্ষ চালক ও অতিরিক্ত ওভারটেকিংয়ের কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাদের স্টাফদের আচরণও ভালো নয়। কাউন্টারে টিকিট আছে কি না জানতে চাইলে অনেক সময় শুনেও না শোনার ভান করে।
আমীর হোসেন নামে একজন বলেন, অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ছাড়ে না। টিকিট নেওয়ার পরও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মারছা পরিবহনের কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, শনিবার মারছা পরিবহনের দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে রেহানা বেগম (৬০) নামের এক নারী ঘটনাস্থলেই মারা যান। তার বাড়ি পটিয়া উপজেলায়। গুরুতর আহত অবস্থায় নাঈমুদ্দিন, দীপ্ত দত্ত, নাইমুল ইসলাম ও মাসুম নামে চারজনকে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছিল। তাদের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলায়।
আহতদের মধ্যে নাঈমুদ্দিন, নাইমুল ইসলাম ও মাসুম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় দীপ্তকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান দোহাজারী হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুস সাত্তার।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনায় পড়া বাস দুটি ছিল বিপরীতমুখী। লোহাগাড়ায় ফোর সিজনস হোটেলের সামনে চলন্ত বাস দুটি একেবারে রাস্তার মাঝামাঝিতে চলে আসে। সাইড নিতে গিয়ে একটির সঙ্গে আরেকটির দুই পাশের সংঘর্ষ হয়।
এতে পূর্ব পাশের বাস রাস্তার পাশে একটি মুদি দোকান ভেঙেচুরে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে থেমে যায়। অন্য বাসটিও রাস্তার পশ্চিম পাশে গাছের সঙ্গে আটকে যায়। দুই বাসের সামনের অংশ একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের টিম গিয়ে বাসের ভেতর আটকে থাকা অবস্থায় পাঁচজনকে উদ্ধার করে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, শুধু মারছা পরিবহন নয়, যেকোনো গাড়ি যদি গতিসীমা লঙ্ঘন করে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা ফিটনেস না থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের প্রধান শাহীনুর আলম খাঁনের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এখানে গাড়ির দোষ নয়, ব্যবস্থাপনার দোষ। বেপরোয়া গতির দায়ে চালকের দোষ হতে পারে। তবে মহাসড়কটি ৬ লাইনে উন্নতি করা গেলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে মারছা পরিবহনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. আলমগীরের বক্তব্য জানতে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি।
এএইচ