images

সারাদেশ

গাজীপুরে একই পরিবারের পাঁচজন হত্যায় মূল অভিযুক্ত অধরা, জনমনে আতঙ্ক

জেলা প্রতিনিধি

১১ মে ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের শিশুসহ ৫ জনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ফোরকান মিয়াকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘটনার ৪ দিন পার হলেও এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। পুলিশ জানিয়েছে, মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে একাধিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর টিম কাজ করছে।

নিহতের স্বজনরা জানান, রাতের অন্ধকারে শারমিন, তার ভাই রসুল মোল্লা ও তিন সন্তানকে হত্যা করেছে পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া। এরপর দর্প ভরে তার ভাই ও ভাইয়ের বউকে হত্যাকাণ্ডের কথা জানিয়ে বলেন, 'সবাইকে মাইরা ফেলছি, আমারে আর পাবি না’ । এরপর থেকে তার কোনো হদিশ নেই, ব্যবহৃত মোবাইল বন্ধ। ঘটনার চারদিন পরও অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। একদিকে নিহত স্বজনদের রক্তমাখা বীভৎস লাশের স্মৃতি, অপর দিকে মূল অভিযুক্ত গ্রেফতার না হওয়ায় অনেকটা ভেঙে পড়েছেন ভুক্তভোগী স্বজনরা।

এ ব্যাপারে নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত মোল্লা বলেন, মামলার তদন্ত পুলিশসহ সরকারি লোকজন করছে। আমি আর কী বলব! তবে অভিযুক্ত ফোরকান দেশেই আছে, তার আত্মীয়- স্বজনদের কারও বাড়িতে আছে। পুলিশ আরও তৎপর হলে তাকে ধরতে পারবে।

তিনি বলেন, অভিযুক্ত ফোরকান আরও একটি বিয়ে করেছে এবং ঢাকায় তার এক ভাবির সঙ্গে যোগাযোগ আছে।

63ccd2e3-636c-448c-b7e5-0c10a83d76a1

হত্যাকাণ্ডের রাতে স্থানীয়রা যেমন দেখেছেন অভিযুক্ত ফোরকানকে

নৃশংসভাবে ৫ খুনের রাতে পাশের দোকান থেকে সন্তানদের জন্য চকলেট, চিপস কিনেছিলেন ফোরকান। এসময় তাকে স্বাভাবিক মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আবদুর রশিদ নামে স্থানীয় দোকান বলেন, শুক্রবার রাত আটটার দিকে ছোট মেয়ে মোসা. ফারিয়াকে কোলে নিয়ে ও উম্মে হাবিবার হাত ধরে দোকানে এসেছিলেন অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া। এসময় বাচ্চাদের জন্য দোকান থেকে চকলেট, চিপস কেনেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এক সঙ্গে ৫ খুনের এই ঘটনা একা কেউ ঘটিয়েছে বলে তাদের মনে হয় না। ঘরের ভেতরে যে বীভৎসতা তা একজনের পক্ষে করা অনেকটা অসম্ভব। একটি ঘরে বিছানার পাশে জানালার গ্রিলে শারমিন আক্তারকে দুই হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। শরীরে নতুন শাড়ি। মুখে টেপ প্যাঁচানো, মুখের বেশির ভাগ কালো কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো, পিঠের পেছনে দেয়ালে রক্তের দাগ। এছাড়া ঘরের মেঝেতে তিন শিশুর রক্তাক্ত মৃতদেহ ও খাটের ওপর শারমিনের ভাই রসুল মোল্লার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। একজনের পক্ষে এত নৃশংসতা কীভাবে সম্ভব!

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এ ঘটনার পর তারা নিজেরাই ভয় ও আতঙ্কে আছেন। তাদের দাবি, অপরাধী যেখানেই থাকুক, তাকে ধরে এনে বিচার করা হোক। স্বামীর কাছে যদি স্ত্রী-সন্তান নিরাপদ না থাকে, তাহলে আর কোথায় নিরাপদ থাকবে। এটার যদি বিচার না হয়, তাহলে দেশে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই অবিলম্বে মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।

থানায় দায়ের করা মামলায় বাদীর অভিযোগ

নৃশংসভাবে ৫ খুনের ঘটনায় নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত মোল্লা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ১৭ বছর আগে আসামি ফোরকানের সঙ্গে শারমিনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর বিভিন্ন সময় আসামি ফোরকান পারিবারিক খুঁটিনাটি বিষয়াদি নিয়ে শারমিনের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে তাকে গালিগালাজ ও মারধর করতো। এসব ঘটনায় বিগত ছয় মাস ধরে শারমিন তার সন্তানদেরসহ কাপাসিয়া থানাধীন রাউৎকোনা পূর্বপাড়া এলাকায় মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসাবে বসবাস করতো। গত ৮ মে তারিখে আসামি ফোরকান বাদির ছেলে মো. রসূল মোল্লাকে গারমেন্টসে চাকুরি দেওয়ার কথা বলে তার বাসায় আসতে বলেন। এরপর ৯ মে সকাল ৫টার দিকে আসামি ফোরকান মোল্লা তার ছোট ভাই মিসকাদের স্ত্রী রাশিদা আক্তারের মোবাইল ফোনে ফোন করে জানায় যে, তার স্ত্রী সন্তানসহ শ্যালক রসূল মোল্লাদের ভাড়াবাসায় হত্যা করে পালিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

কাপাসিয়ায় একই পরিবারের ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা

অভিযোগে তিনি আরও বলেন, তার দৃঢ় বিশ্বাস আসামি ফোরকান মোল্লাসহ অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জন আসামি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে রাতের যেকোনো সময় শারমিন, তার মেয়ে মীম, মারিয়া, ফারিয়া এবং শারমিনের ভাই রসূল মোল্লাদের রাতের খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ অথবা অন্যকোনো অচেতন করার সামগ্রী মিশ্রিত খাওয়ায়ে অচেতন করে ধারালো চাপাতি দিয়ে হত্যা করেছে।

ময়নাতদন্তে ফরেনসিক রিপোর্টে কী আছে

নিহত শারমিনসহ অপর ৪ জনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। নিহতদের মধ্যে চারজনকে গলাকেটে অপর শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. মাজহারুল হক।

তিনি বলেন, ময়না তদন্তে নিহত শারমিন, তার ভাই রসুল মোল্লা, মেয়ে মিম ও মারিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে গলাকাটা। এছাড়া অপর দেড় বছরের শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের আগে নিহতদের কোনো চেতনা নাশক বা অন্য কিছু খাইয়ে ছিল কী না তা নির্ণয় করতে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পেলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।

কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুর আলম বলেন, নৃশংসভাবে ৫ জনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়াকে প্রধান আসামি ও অজ্ঞাত আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে কাপাসিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের একাধিক টিম অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেফতারে তৎপর রয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় আটক দুইজন ডিবি হেফাজতে রয়েছে। তদন্ত চলছে, মূল অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেফতার করা হলে এ মামলার রহস্য উন্মোচন করা যাবে।

তিনি আরও বলেন, মরদেহগুলোর সঙ্গে কম্পিউটারে টাইপ করা অভিযোগের কাগজ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে জানা যায়, ৩ মে ফোরকান মিয়া গোপালগঞ্জ সদর থানায় তার স্ত্রী, শ্বশুরসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অর্থ আত্মসাৎ ও পরকীয়ার অভিযোগ করেন। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।

প্রতিনিধি/এসএস