জেলা প্রতিনিধি
১০ মে ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের শিমরাইলকান্দি থেকে বিজয়নগর উপজেলার নূরপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের নির্মাণকাজ প্রায় এক দশক আগে শুরু হয়েছিল। ২০১৬ সালে কাজ শুরু হওয়া সড়কটি ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালেও এর পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি এলাকাবাসী। মাঝপথে বোয়ালিয়া খালের উপর সেতুর কাজ দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকায় ভোগান্তি কাটছে না স্থানীয়দের।
জেলা ও উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিরাইলকান্দি থেকে বিজয়নগরের পত্তন ইউনিয়নের সীমানা পর্যন্ত নূরপুর জিসি-কালীবাড়ি আরএন্ডএইচ সড়কের সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সড়কটি ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হয়। সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা।
সড়কের দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১৮ থেকে ২৪ ফুট। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ডলি কন্সট্রাকশন ও ইনফ্রাটেক যৌথভাবে (জয়েন্ট ভেঞ্চারে) ৩৯ কোটি ৪১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়কের কাজ শুরু করে। ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ সড়কের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে প্রথমে ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০২২ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলেও প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। ১০ বছরেও প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডলি কন্সট্রাকশন কাজ ফেলে চলে যায়। পরে জেলা শহরের অন্য ঠিকাদাররা ডলি কন্সট্রাকশনের পক্ষে সড়কের মাটি ভরাট, দুই পাশে নিরাপত্তা দেয়াল, ব্লক, কালভার্ট ও পুরনো সেতু ও সড়কের উপর ইটের সলিং (হেরিং বন্ড) ইত্যাদি কাজ ২০১৯ সালের প্রথমদিকে শেষ করে।

‘নাম’ নিয়ে অতি উৎসাহী
স্থানীয়রা জানান, সড়কটির দাফতরিক নাম ‘নূরপুর জিসি-কালীবাড়ি আরএন্ডএইচ সড়ক হলেও স্থানীয়ভাবে এটি সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক নামেই পরিচিত। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে সড়কের নির্মাণকাজের ফলক উদ্ধোধন করেন। এরপরই থেকে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী ও প্রশাসনের অতি উৎসাহে এটি ‘শেখ হাসিনা সড়ক’ নামে পরিচিতি পায়। তবে সরকারের পট পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের কেউ কেউ এটিকে 'শেখ হাসিনা সড়ক' আবার কেউ কেউ 'সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক' বলেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পের শুরুতে ৩ বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা বেধে দিয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতা আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গড়িমসির কারণে ২০১৯ সালের সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২০২২ সালে তড়িঘড়ি করে সড়কটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও এর বড় একটি অংশের নির্মাণকাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। বিশেষ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ গত দুই-আড়াই বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বিজয়নগর উপজেলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের সংযোগকারী নূরপুর জিসি-কালীবাড়ি আরএইচ সড়কের (সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক) তিতাসের শাখা নদী বোয়ালিয়া খালের উপর ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মাণের কাজ পান ঠিকাদার খায়রুল হাসান। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর জানুয়ারি কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ২১ মে এর মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার কথা। কিন্তু এখনো সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। এদিকে, সেতুর নির্মাণকাজে বিলম্ব হওয়ায় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানাে হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সেতুর কাজ বিলম্ব হওয়ায় ভোগান্তি চরমে
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, শিমরাইলকান্দি থেকে এই সড়কের বোয়ালিয়া খালের মাঝে ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর পশ্চিমদিকে উইং ওয়াল থেকে চারটি পিলার পর্যন্ত বেইস ঢালাই দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের সেতুর নিচে ঝালাইয়ের কাজ করতে দেখা গেছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে সেতু সংলগ্ন মাটির সড়কটি কাঁদায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীরা গাড়ি থেকে মেনে ওই অংশ পার হচ্ছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাসসহ সব যান কাঁদায় আটকে যাচ্ছে। অন্য চালকরা ঠেলে ঠেলে গাড়ি পার করতে দেখা গেছে। পত্তন ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর মোড় থেকে নূরপুর পর্যন্ত এলাকার রাস্তা সরু, আঁকাবাঁকা এবং ছোট-বড় ভাঙন রয়েছে।
বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের লক্ষ্মীমোরার বাসিন্দা সোলমান মিয়া বলেন, সেতুর পিলারের উপর কাজ হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘ দুই বছর। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে চলে গিয়েছিল। এখন কাজ শুরু করলেও ধীর গতিতে চলছে কাজ। কবে যে সেতুর কাজ শেষ হবে। যানচলাচলে মারাত্মক ভোগান্তি হচ্ছে। বলা হয়েছিল ২০২২ সালে কাজ শেষ হবে, কিন্তু সেতুর কাজ না হওয়ায় আমাদের এখনো ভাঙা রাস্তা আর বিকল্প পথে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। ৯ কিলোমিটার রাস্তা বানাতে ১০ বছর লাগলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের শান্তামুড়া গ্রামের বাসিন্দা রফিক মিয়া বলেন, সড়কের লক্ষ্মীপুর থেকে নূরপুর পর্যন্ত রাস্তা অনেক সরু ও আঁকাবাঁকা। এই রাস্তাটি প্রশস্তকরণের দাবি জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী। এমনিতেই সড়কটির নির্মাণকাজে অনেক বিলম্ব হয়েছে। এই সড়ক দিয়ে চলাচলে জেলার সঙ্গে বিজয়নগর উপজেলার প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বের পাশাপাশি সময়ও কমবে এবং উপজেলাবাসীর যাতায়াত দুর্ভোগ দূর হবে।

ঠিকাদার খায়রুল হাসান বলেন, ৬০ মিটার সেতু নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ভালো পড়েনি। তাদের তাল বাহানার কারণে কাজ বিলম্ব হয়েছে। বর্ধিত সময় এখনো শেষ হয়নি, আরো এক মাস আছে। বর্তমানে সেতুর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই ঢালাইয়ের কাজ শুরু হবে। কোরবানির ঈদের আগেই সেতুর কাজ সমাপ্ত হয়ে যাবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল বলেন, সড়কটির নির্মাণকাজ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে সড়কের একটি সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেতুর কাজ দ্রুত সম্পন্নের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে। আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে সড়কের কাজ শেষ হয়ে যাবে। প্রকল্পে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণে সময় ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, সড়কটি নাম নূরপুর জিসি থেকে কালীবাড়ি সড়ক। আমাদের গেজেটে শেখ হাসিনা সড়ক নামের কোনো কিছুই নেই। বিগত সরকারের সময় অতি উৎসাহী হয়ে এটিকে শেখ হাসিনা সড়ক নামে অভিহিত করা হয়েছে। নূরপুরে ১৮ ফুট প্রশস্ত ধরা আছে। কিন্তু স্থানীয়রা জায়গা দিতে রাজি হচ্ছেন না।
প্রতিনিধি/এসএস