জেলা প্রতিনিধি
০৯ মে ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও জ্বালানির অপ্রতুলতায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এমন পরিস্থিতিতে ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষিতে বাড়ছে সৌরচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার।
বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি নির্ভর এই প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে এখন হয়ে উঠেছে আশার প্রতীক। এতে একদিকে যেমন কমছে সেচ খরচ, অন্যদিকে চলতি বোরো মৌসুমেই সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ কৃষি মাঠজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে সৌর প্যানেলের সারি। সূর্যের আলো থেকেই উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চলছে সেচ কার্যক্রম।

জেলার কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার ঠাকুরগাঁওয়ে ৬২ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৯১টি সৌরচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এসব পাম্প ব্যবহার করছেন প্রায় ৩৫ হাজার কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানান, সৌর সেচ ব্যবস্থার কারণে এক মৌসুমেই সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ লিটার ডিজেল ও বিদ্যুৎ। যার আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই প্রযুক্তি। ফলে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি খাত।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের মোলানী গ্রামের বাসিন্দা মো. সলেমান আলী নিজ উদ্যোগে সৌর সেচ পাম্প তৈরি করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে সৌরশক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরিশ্রমের পর ২০১৪ সালে তিনি তৈরি করেন ব্যাটারিবিহীন সৌরচালিত সেচ পাম্প। এরপর ২০১৫ সাল থেকে স্থানীয় কৃষকদের সেচ সুবিধা দিয়ে আসছেন তিনি।
সলেমান আলী জানান, বর্তমানে তার তৈরি ২৬টি সৌর সেচ পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকরা যেমন কম খরচে সেচ সুবিধা পাচ্ছেন, তেমনি জ্বালানি সংকট থেকেও মুক্তি পাচ্ছেন।

কৃষকরা বলছেন, ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থায় এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে যেখানে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে সৌর সেচ পাম্প ব্যবহারে সেই খরচ নেমে এসেছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ কমছে এবং লাভ বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষক নাসিরুল ইসলাম বলেন, তেলর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন সৌর পাম্পে সহজেই সেচ দিতে পারছি।
আরেক কৃষক আব্দুল গফুর বলেন, খরচ কম হওয়ায় এখন কৃষিকাজে স্বস্তি ফিরেছে। সরকার যদি সহজ শর্তে ও অল্প টাকায় এই প্রযুক্তি দেয়, তাহলে আরও কৃষক উপকৃত হবে।

কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, বর্তমানে যে তেলের জন্য হাহাকার ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই দুঃসময়ে সোলার সেচ পাম্প আমাদের কৃষকদের পাশে বন্ধু স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আশরাফুল ইসলাম নামে কৃষক বলেন, শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিতে খরচ বেশি হয়। আর বর্তমানে ঠিকমতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে মেশিন বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। আর শ্যালো মেশিন বহন করতে অনেক পরিশ্রম হয়। আর সোলার সেচ পাম্প দিয়ে সহজে সেচ দেওয়া যায়, খরচ কম লাগে।

জ্বালানি সংকটের কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অনেকে ঠাকুরগাঁওয়ে এসে এই প্রযুক্তি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। আগত ক্রেতা মফিউর ফরাজি, ফরহাদ রব্বানি বলেন, দেশজুড়ে এই উদ্ভাবন ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে সরকারের ব্যয় কমবে, কমবে নির্ভরশীলতাও। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর চাপ কমবে। একইসঙ্গে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, সৌরচালিত সেচ পাম্প ব্যবহারে কৃষকরা ইতোমধ্যে লাভবান হচ্ছেন। জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায় এটি অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি। কৃষি বিভাগ এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণে কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে আরও বেশি কৃষক সৌর সেচ ব্যবস্থার আওতায় আসবেন।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ পাম্প ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে নতুন ভরসা। খরচ কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে কৃষির ভবিষ্যৎ।
প্রতিনিধি/এসএস