images

সারাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক, সক্রিয় ৫ শতাধিক কারবারি

০৮ মে ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। প্রতিদিন জেলার ভারত সীমান্তবর্তী বিজয়নগর, আখাউড়া ও কসবা উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পাচার হয়ে আসছে হরেক রকমের মাদকদ্রব্য। জেলাজুড়ে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও কিছুতেই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের একটি অংশেই ৬১টি মাদকের ‘স্পট’ রয়েছে।

জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো দিয়ে পাচার হয়ে আসা গাঁজা, ইয়াবা, ইস্কফ সিরাপ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ও ফেনসিডিলসহ নানা জাতের মাদক সড়ক, রেল ও নৌপথে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী তিন উপজেলাসহ জেলার অন্যান্য এলাকার বাসাবাড়িতেও মাদক বিক্রি হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, মাদক কারবার এখন অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই অবস্থায় পুলিশের পক্ষ থেকে জেলার মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি এবং নিয়মিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়ায় অন্তত তিনশ মাদক কারবারি সক্রিয়। এর মধ্যে ৮১ জনের বিরুদ্ধে ৪ থেকে ২০টি পর্যন্ত মামলা থাকলেও তারা এখনো মাদক ব্যবসায় জড়িত। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাদক আসে কসবা ও বিজয়নগর দিয়ে। আখাউড়া উপজেলা দিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি মাদকও প্রবেশ করছে। এসব মাদক মূলত সড়কপথ ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের কাশিনগর গ্রামে মাদক কারবারির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ওই এলাকার জসিম উদ্দিন, সবুজ মিয়া, জহিরুল ইসলাম, আয়েশা বেগম, বাবু মিয়া, সজল মিয়া, মামুন মিয়া, আলামিন, ফারুক মিয়া, খোকন মিয়া ও কালু মিয়া চিহ্নিত মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিজয়নগর উপজেলার উথারিয়া পাড়া এলাকার সবচেয়ে বড় মাদক কারবারি শাহ পরাণ, যার বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মাদক মামলা রয়েছে। এ ছাড়া আখাউড়া উপজেলার ছোট কুড়িপাইকার জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা রয়েছে। ১২টি করে মামলা থাকা সত্ত্বেও মাদক কারবারে সক্রিয় রয়েছেন বিজয়নগরের কেশবপুরের কালু মিয়া ও কাশিনগর পশ্চিম পাড়ার সজল মিয়া। কসবা উপজেলার গঙ্গানগর মাইজহাটির স্বপন মিয়া, আকবপুরের জসিম মিয়া, সবুজ মিয়া, লতুয়ামোড়ার শফিক, মন্দবাগের হানিফ, উত্তর চকবস্তার জুয়েল, গোবিন্দপুরের রনি (ওরফে রানা) ও কালিকাাপুরের লোকমান অন্যতম।

আখাউড়া উপজেলার উল্লেখযোগ্য মাদক কারবারিরা হলেন নুরপুরের জাকির হোসেন, দুলাল মিয়া, দেবগ্রামের সোহাগ মোল্লা, বড় লৌহঘরের খলিল মিয়া, ছোট কুড়িপাইকার জয়নাল আবেদীন, সবুজ হোসেন, হীরাপুরের আবদুল্লাহ, সুমন, কাপ্তান, জামাল, রাজাপুরের নাসির, ধলেশ্বরের কিবরিয়া, মোগড়ার বাবু এবং আমোদাবাদের করিম। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে; কেউ কারাগারে আছেন, আবার কেউ আত্মগোপনে থেকে গোপনে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মুহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছি এবং সে অনুযায়ী অভিযান চলছে। তবে মাদক কারবারিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে পুনরায় একই পেশায় লিপ্ত হচ্ছে। আমরা কারবারিদের তালিকা হালনাগাদ করছি এবং সামাজিক সচেতনতায় সমাবেশ করছি। মাদকের ব্যাপারে কোনো আপস নেই।’

গত ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে এক মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘মাদক ব্যবসা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যোগদানের পর আমি মাদকের বিষয়ে কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদক নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে আমরা সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করব।’

এদিকে, গত ২ মে বিজয়নগর উপজেলার ছতরপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক মাদকবিরোধী সমাবেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, ‘মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবার, সমাজ ও পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা মানবতার শত্রু। তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ তিনি সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

প্রতিনিধি/একেবি