জেলা প্রতিনিধি
০৮ মে ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম
ঐতিহ্যবাহী ফসলের পাশাপাশি নতুন ও পুষ্টিকর সবজি চাষে ভাগ্য বদলাচ্ছেন রাজবাড়ীর কৃষকরা। রাজবাড়ী জেলা সদরের সুলতানপুর ইউনিয়নের শাইলকাঠি গ্রামে এবার বিটরুট চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বিশেষ করে কৃষক লিয়াকত সরদারের বাম্পার ফলন ও অভাবনীয় মুনাফা দেখে এলাকার অন্য চাষিদের মধ্যেও বিটরুট চাষে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে শাইলকাঠি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন বিটরুটের আবাদ। কৃষক লিয়াকত সরদার এ বছর ৪০ শতাংশ জমিতে এই বিদেশি সবজির চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি শতাংশ জমিতে গড়ে ৪ মণ করে বিটরুট ফলন হয়েছে। ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারদর নিয়েও তিনি সন্তুষ্ট।
লিয়াকত সরদারের এই সাফল্য দেখে শাইলকাঠি গ্রামের আরও অনেক কৃষক বিটরুট চাষে এগিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে কৃষক সুজাত মোল্লা ৪ শতাংশ এবং বাচ্চু মোল্লা ৫ শতাংশ জমিতে বিটরুট চাষ করেছেন। অল্প জমি হলেও উভয়েই আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজবাড়ীর এই উন্নত মানের বিটরুট এখন ছড়িয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও। রাজবাড়ীর বিটরুট বর্তমানে ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও পাবনাসহ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে এই সবজির চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।
সার্বিকভাবে রাজবাড়ী জেলায় শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৫,১০০ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে বিটরুটের মতো উচ্চমূল্যের সবজি চাষ হচ্ছে। শাইলকাঠি গ্রামের এই কৃষকদের অভাবনীয় সাফল্য এবং পার্শ্ববর্তী জেলাসহ ঢাকায় এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে জেলায় বিটরুট চাষের পরিধি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বল্প সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় রাজবাড়ী জেলায় বিটরুট চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সঠিক বাজারজাতকরণ সুবিধা পেলে এই সবজি চাষ জেলাজুড়ে আরও বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
কৃষক লিয়াকত সরদার তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আমি এ বছর জানুয়ারি মাসে বিটরুটের বীজ রোপণ করেছিলাম। সঠিক পরিচর্যার পর এপ্রিল মাস থেকে আমি পুরোদমে ফসল সংগ্রহ শুরু করেছি। অল্প সময়ে এমন ফলন ও লাভ হবে তা ভাবিনি। শুরুর দিকে ২ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি, এখন দাম কিছুটা কমলেও (১২০০ টাকা) বিটরুট চাষে অন্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভ থাকছে।

কৃষক সুজাত মোল্লা তার ৪ শতাংশ জমিতে বিটরুট চাষের সফলতা নিয়ে বলেন, লিয়াকত ভাইয়ের সাফল্য দেখে আমি মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বিটরুট লাগিয়েছিলাম। অল্প জমিতেও যে এত ভালো ফলন আর লাভ হবে তা ভাবিনি। বাড়ির আঙিনায় এইটুকু চাষ করেই আমি বেশ ভালো টাকা হাতে পেয়েছি, যা পরিবারের ছোটখাটো অনেক খরচ মেটাতে সাহায্য করছে। আগামীতে আমি আরও বড় পরিসরে এই চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি।
অন্যদিকে ৫ শতাংশ জমিতে চাষ করা কৃষক বাচ্চু মোল্লা তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিটরুট আমাদের জন্য নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। ৫ শতাংশ জমি থেকে আমি যে পরিমাণ ফসল পেয়েছি এবং বাজারে তা বিক্রি করে যে লাভ হয়েছে, তা অন্য প্রথাগত ফসলের চেয়ে অনেক বেশি। অল্প পুঁজিতে অল্প সময়ে এটি একটি দুর্দান্ত অর্থকরী ফসল। আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের জন্য বিটরুট চাষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভজনক।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ, বিটরুট চাষের সাফল্যের পেছনে শাইলকাঠি গ্রামের মাটির উপযোগিতা এবং কৃষকদের আধুনিক চাষ পদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ করাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিয়মিত সশরীরে মাঠে উপস্থিত থেকে বীজ বপন, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে রোগবালাই দমনের কারিগরি পরামর্শ প্রদান করে কৃষকদের সহায়তা করছেন। তার মতে, মাত্র তিন-সাড়ে তিন মাসের এই স্বল্পমেয়াদি ফসলটি স্থানীয় কৃষকদের দ্রুত আর্থিক সচ্ছলতা এনে দিচ্ছে এবং এর উৎপাদিত পণ্য ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে সরবরাহ হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ভবিষ্যতে এই সাফল্যের ‘মডেল’ পুরো ইউনিয়নে ছড়িয়ে দিতে অধিকসংখ্যক কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং উন্নত মানের বীজ ও ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জনি খান বলেন, জেলার মাটি ও জলবায়ু বিটরুট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী এবং এই উচ্চমূল্যের সবজি প্রথাগত ফসলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লাভজনক। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের নিয়মিত মাঠ পর্যায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, কারিগরি সহযোগিতা এবং সঠিক পরামর্শের কারণেই কৃষকরা অল্প সময়ে বাম্পার ফলন ও কাঙ্ক্ষিত বাজারমূল্য পাচ্ছেন। রাজবাড়ীর উৎপাদিত বিটরুট বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। আগামীতে এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে আরও বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় এনে বিটরুট চাষকে জেলাজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিনিধি/এসএস