images

সারাদেশ

হাওরে ডুবে আছে সোনালি স্বপ্ন, ফসলহানিতে দিশেহারা কৃষক

জেলা প্রতিনিধি

০৭ মে ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম

হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বৈশাখ মানেই ছিল উৎসবের আমেজ, নতুন ধানের ঘ্রাণ আর পিঠাপুলির আনন্দে ভরপুর দিন। কিন্তু এবারের বৈশাখ যেন সেই চিরচেনা আনন্দ কেড়ে নিয়ে এসেছে দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার। মাঠজুড়ে নেই ফসল তোলার ব্যস্ততা, নেই কৃষকের মুখে হাসি-বরং চোখে ভাসছে হারানোর বেদনা।

hobi_3

জেলার বিভিন্ন হাওরে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশ ধান কাটা সম্ভব হলেও বাকি দুই-তৃতীয়াংশ জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও বা কাটা ধান শুকাতে না পেরে পচে গেছে, আবার কোথাও স্তূপ করে রাখা ধানে গজিয়েছে চারা। কৃষকের চোখের সামনে তাদের কঠোর পরিশ্রমে ফলানো সোনালি ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

নবীগঞ্জ উপজেলার বৈলাকিপুর গ্রামের কৃষক অলিউর রহমান জানান, তিনি জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন এবং কাটতেও পেরেছিলেন। কিন্তু রোদ না থাকায় সব ধান পচে গেছে।

hobi_2

তিনি বলেন, খাওয়ার মতো এক মণ ধানও থাকবে না। এসব পচা ধান বিক্রি করা যাবে কি না, তাও জানি না। কৃষিকাজ করে আর কোনো লাভ দেখছি না।

বৈশাখের আনন্দের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এ সময়টা আমাদের সবচেয়ে আনন্দের। কিন্তু এবার কারও মুখে হাসি নেই।

hobi_1

বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, খোয়াই নদীর পানি সামান্য বাড়লেই হাওর প্লাবিত হয়। এবার ধান পাকার সময়েই পানি ঢুকে পড়ায় অধিকাংশ ফসল তলিয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এবার নিজেদেরই খাবার নেই, উৎসব করব কী দিয়ে?

ধানচাষী শিবলী চৌধুরী জানান, তিনি মাত্র ৩০ শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন, বাকিটা পানির নিচে।

আতুকুড়া গ্রামের এস এম সুরুজ আলী বলেন, শ্রমিক সংকট ও পানির কারণে হারভেস্টার নামানো সম্ভব হয়নি। যে সামান্য ধান কাটা গেছে, সেটিও ভেজা থাকায় পচে গেছে।

সব মিলিয়ে, হাওরের মানুষের কাছে বৈশাখ আর উৎসবের নয়-এবার তা হয়ে উঠেছে বেদনার প্রতীক। সোনালি ধানের মৌসুমেই যখন ঘরে ওঠার কথা ছিল সুখের হাসি, তখনই সেই ধান ডুবে গিয়ে নিয়ে এসেছে অজানা অনিশ্চয়তা আর কষ্টের দীর্ঘ ছায়া।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন চাল। তবে এখন পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে কাটা হয়েছে ৪৪ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমির ধান, আর বাকি ৭৮ হাজার ৯০৫ হেক্টর জমির ধান এখনও কাটার অপেক্ষায়-যার একটি বড় অংশ পানির নিচে।

জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন হতো। তিনি কৃষকদের আগাম চাষাবাদ ও কম সময়ের ধান আবাদে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন।

জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতে খোয়াই নদীর পানি বেড়ে কিছু এলাকায় বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ২৪ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উজান থেকে নামা ঢল কমে আসায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশাও দেখছেন তিনি। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে এবং ইতোমধ্যে হেলপলাইন চালু করা হয়েছে।

প্রতিনিধি/ এজে